ওড়িশা (Odisha)


ভুবনেশ্বর (Bhubaneswar)- ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বর। একদা কলিঙ্গ রাজধানী ইতিহাস প্রসিদ্ধ ভুবনেশ্বরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অতীত ইতিহাসের সাক্ষী মন্দিরগুলিই প্রধান আকর্ষণ। পাঁচশোরও বেশি মন্দির আছে মন্দিরনগরী ভুবনেশ্বরে। এরমধ্যে উল্লেখ্য- সপ্তম শতাব্দীতে নির্মিত পরশুরামেশ্বর মন্দির, অষ্টম শতকে তৈরি বৈতাল মন্দির, দশম-একাদশ শতকে গড়ে ওঠা মুক্তেশ্বর মন্দির। এরই সমসাময়িক রাজারানি, ব্রহ্মেশ্বর এবং লিঙ্গরাজ মন্দির। মন্দিরগুলির গায়ের ওড়িশি ভাস্কর্যের অপরূপ শিল্পকলা দর্শককে মুগ্ধ করবে।
১০০০ খ্রীষ্টাব্দে রাজা ললাট কেশরী লিঙ্গরাজ মন্দিরটি নির্মাণ করেন। বিশাল এই মন্দিরপ্রাঙ্গণে একসময় ১০৮টি মন্দির ছিল। মূল মন্দিরের উচ্চতা ১৬৫ফুট। মন্দিরপ্রাঙ্গণটির দৈর্ঘ্য ৫২০ ফুট ও প্রস্থ ৪৬৫ ফুট। গ্র্যানাইট পাথরে তৈরি চক্রাকার লিঙ্গরাজ মন্দিরের মূল প্রবেশদ্বার তিনটি। কলিঙ্গ স্থাপত্যের রীতি অনুযায়ী মন্দিরটি বিমান, জগমোহন, নাটমন্দির ও ভোগমন্দিরে এই চারঅংশে বিভক্ত। মন্দির ও প্রাচীরের গাত্র ফুল, লতাপাতা প্রভৃতি সূক্ষ্ম কারুকার্য মন্ডিত। মন্দিরমধ্যে গণেশ, কার্তিক, পার্বতীর মূর্তি রয়েছে।
মন্দিরের কাছেই বিন্দু সরোবর। এই সরোবরকে ঘিরে গল্পকথা রয়েছে। পার্বতীর তৃষ্ণা মেটানোর জন্য শিব সমস্ত নদনদীর কাছে অনুরোধ করেন বিন্দু বিন্দু জল দেওয়ার জন্য। সেই বিন্দু বিন্দু জল থেকেই এই সরোবরের সৃষ্টি। কথিত আছে, এই সরোবরে স্নান করলে সর্বপাপ মুক্ত হওয়া যায়। চন্দনযাত্রার সময় লিঙ্গরাজ এই সরোবরে স্নান করেন।
বিন্দু সরোবরের পূর্বপাড়ে অনন্ত বাসুদেব মন্দির। প্রাচীন এই বিষ্ণুমন্দিরটি সম্ভবত ১২৭৮-এ অনঙ্গ ভীমদেবের কন্যা চন্দ্রাদেবী নির্মাণ করেন। মন্দিরের কারুকার্য দেখার মতো।
সিদ্ধারণ্য বা সিদ্ধঅরণ্যটি একসময়ে আম্রকানন বলে পরিচিত ছিল। এখন কেদারগৌরী বা গৌরীকুন্ডের প্রস্রবণটি পুণ্যপুকুর নামে খ্যাত। এখানে রয়েছে নবম শতকে তৈরি মুক্তেশ্বর মন্দিরটি। হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের মিশ্র প্রভাবের ভাস্কর্যে গড়া দেবমূর্তিগুলো দেখার মতো। এখানে সিদ্ধেশ্বর মন্দিরে গণেশের দন্ডায়মান মূর্তিটি অসাধারণ। মুক্তেশ্বরের বিপরীতে ৬৫০ খ্রীষ্টাব্দে তৈরি পরশুরামেশ্বর মন্দির। কেদারেশ্বর মন্দিরটি ষষ্ঠ শতকের। কেদারেশ্বরে দুধগঙ্গার জলে নানা ব্যাধির উপশম হয় বলে বিশ্বাস।
সিদ্ধারণ্যের কাছে সুন্দর এক বাগিচার মধ্যে রাজারানি মন্দির। একাদশ শতাব্দীতে তৈরি সূক্ষ্ম কারুকার্য মন্ডিত এই মন্দির ৫৮ ফুট উঁচু। দেওয়ালে, থামে, কুলুঙ্গিতে নানা দেবদেবী, সুন্দরী নারীমূর্তির বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ছোট ছোট কাজ দেখার মতো। কথিত আছে, রাজা উদ্যত কেশরী তাঁর রানির ইচ্ছেয় এই মন্দির গড়েন, নাম দেন রাজারানি।
ভুবনেশ্বর থেকে কোনারকের পথে পুরী রোডে ৫কিমি এগিয়ে ধৌলিচক থেকে ডানদিকে আরও ৩কিমি দূরে ধৌলিগিরি। ধৌলিতে অশোক পাহাড়ের গায়ে খোদিত রয়েছে কলিঙ্গরাজ অশোকের কাহিনী। এখানেই ঐতিহাসিক কলিঙ্গ যুদ্ধ ঘটে খ্রীস্টপূর্ব ২৬১-তে কলিঙ্গরাজ ও অশোকের মধ্যে। ইতিহাসের সাক্ষী দয়ানদী আজও বয়ে চলেছে। প্রায় ১৬ফুট বাই ১০ফুটের একটি পাথরের শিলায় সম্রাট অশোকের ১৩টি রাজাজ্ঞা লিপিবদ্ধ রয়েছে। ১৯৭২ সালে পাহাড়চূড়ায় জাপান ও বৌদ্ধসংঘের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে বিশ্বশান্তি স্তূপ। শ্বেতপাথরের স্তূপের চারপাশে আছে চারটি বিশেষ সময়ের বুদ্ধমূর্তি। পাশেই ধবলশ্বের শিবমন্দির। এখান থেকে সূর্যাস্তের দৃশ্যও মনোরম। কাছেই অশোকের সমসাময়িক নগরী শিশুপালগড়ের ধ্বংসাবশেষ।
ভুবনেশ্বর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে হিরাপুরে এগারো শতকে নির্মিত চৌষট যোগিনী মন্দির। সারা ভারতের চৌষট যোগিনী মন্দির চারটির মধ্যে এটি অন্যতম একটি। খোলা আকাশের নীচে প্রাচীরের গায়ে ৬৪টি যোগিনী মূর্তি দেখার মতো।
ভুবনেশ্বরের আরেক আকর্ষণ ওড়িশা স্টেট মিউজিয়াম ও ২০ কিলোমিটার দূরে চিড়িয়াখানা নন্দনকানন। ১৯৬০ সালে ৪২৬ হেক্টর জায়গা জুড়ে নন্দনকানন তৈরি হয়।
এখানে সাদা বাঘ ও সিংহ দেখার জন্য আলাদা সাফারির ব্যবস্থা আছে। এছাড়াও চিড়িয়াখানায় রয়েছে চিতাবাঘ, ব্ল্যাক প্যান্থার, হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ার, ইউরোপিয়ান ব্রাউন বিয়ার, ঘড়িয়াল, শিম্পাঞ্জি, বেবুন প্রভৃতি বন্যপশু। একপাশে সরীসৃপ ঘর। এখানে টয়ট্রেন রাইড আর লেকের জলে বোটিংয়ের ব্যবস্থা আছে।
ভুবনেশ্বর শহর থেকে ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে ৮কিমি পশ্চিমে পূর্বঘাট পর্বতমালার এপারে খণ্ডগিরি, ওপারে উদয়গিরি। খ্রীষ্টপূর্ব ২ শতকে গ্র্যানাইট পাহাড় কুঁদে তৈরি হয়েছিল এই গুহাগুলি।
গ্র্যানাইট পাথরের উদয়গিরির উচ্চতা ১১৩ফুট। উদয়গিরিকে বৌদ্ধদের গুহাও বলা হয়। উদয়গিরিতে মোট ৪৪টি গুহা আছে। সবকটি গুহা দেখতে অনেক সময় লেগে যায়। ফুলের গাছে সাজানো সিঁড়ি বেয়ে উঠে প্রথমেই পড়বে স্বর্গপুরী গুহা। এখানে আছে সুন্দর একটি হস্তিমূর্তি। এই গুহা পেরিয়ে রানিগুহা। ভাস্কর্যময় এই গুহায় আছে যুদ্ধ, বিজয়মিছিল, হস্তী, নারী, নর্তকীমূর্তি। এরপর গণেশ গুহা। হস্তিগুহার কাছের শিলালিপিটি বৌদ্ধ বা জৈনধর্মের। এতে কলিঙ্গরাজ খারবেলার জীবনচরিত ও অনুশাসন লিপিবদ্ধ আছে বলে অনুমান করা হয়। মহাবীর এই উদয়গিরিতে কিছুদিন অবস্থান করেন বলে শোনা যায়। এরপরে একে একে আরও দেখে নিতে হবে সর্প গুহা, অনন্ত গুহা, জয়া-বিজয়া গুহা।
উদয়গিরির গুহাগুলি দেখতে দেখতেই পৌঁছে যাওয়া যাবে খণ্ডগিরিতে। খণ্ডগিরি জৈন তীর্থক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। এখানে ১৯টি গুহা আছে। এখানকার অনেকগুলি গুহার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ত্রিশূলা গুহা, গণেশ গুহা, বাঘ গুহা প্রমুখ। অনেকগুলি গুহাতেই অপরূপ ভাস্কর্য মুগ্ধ করে। গুহাগুলো পেরিয়ে উপরে উঠে জৈন তীর্থংকর ২৪তম মহাবীর ও ২৩তম পার্শ্বনাথের মন্দির। এর উপর থেকে ভুবনেশ্বর শহরকে খুব সুন্দর দেখায়। পাহাড়ের পশ্চাৎপটে অপরূপ অরণ্যশোভা।
ভুবনেশ্বর থেকে ৪০কিমি পশ্চিমে উষ্ণ প্রস্রবণ অত্রি।

যাওয়াঃ- নিকটতম রেলস্টেশন ভুবনেশ্বর। শহর থেকে ৪কিমি দূরে বিমানবন্দর। অটোয় অটোয় ভুবনেশ্বরের আশ-পাশ বেড়িয়ে নেওয়া যায়। ভুবনেশ্বর থেকে কন্ডাক্টেড ট্যুরে বা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় গাড়িতে/বাসে বেড়িয়ে নেওয়া যায় উদয়গিরি- খণ্ডগিরি, ধৌলি, কোনারক, ও পুরী।

থাকাঃ- ওড়িশা স্টেট মিউজিয়ামের কাছেই সরকারি পান্থনিবাস। এছাড়া শহরজুড়ে অজস্র হোটেল আছে। ভুবনেশ্বরের এস টি ডি কোডঃ- ০৬৭৪।

কেনাকাটাঃ- ওড়িশার হস্তশিল্প ও তাঁতশিল্প বিশেষ উল্লেখযোগ্য। স্টেট এম্পোরিয়াম উৎকলিকা, ওড়িশা স্টেট হ্যান্ডলুম উইভার্স কো-অপারেটিভ। ওড়িশা স্টেট হ্যান্ডলুম ডেভেলপমেন্টে কর্পোরেশন কেনাকাটার জন্য ভালো জায়গা। সরকারি দোকানপাট রবিবার বন্ধ থাকে।

উৎসবঃ- পুরীর মতো লিঙ্গরাজ মন্দিরকে কেন্দ্র করেও রথযাত্রা, দোলযাত্রা, চন্দনযাত্রা উৎসব হয়। বৈশাখ মাসে অক্ষয়তৃতীয়া থেকে শুক্লাষ্টমী পর্যন্ত চন্দনযাত্রা উৎসব চলে।

#puri #orissa #Odisha #sealda #Howrah #jagannath #temple #lingaraj #buddha #konark #sun
#Bhubaneswar
#পুরী #উড়িষ্যা#ওড়িশা #শিয়ালদা #হাওড়া #জগন্নাথ #লিঙ্গরাজ #বুদ্ধ #কোনারক #সূর্য #মন্দির.
#ভুবনেশ্বর #উদয়গিরি #খন্ডগিরি