Churn : Universal Friendship
Welcome to the CHURN!

To take full advantage of everything offered by our forum,
Please log in if you are already a member,
or
Join our community if you've not yet.

Share
Go down
avatar
Primary
Primary
Posts : 113
Points : 339
Reputation : 3
Join date : 2018-03-05
View user profile

পুরী ভ্রমণ কথা প্রথম পর্ব ( ভূমিকা )

on Wed Mar 07, 2018 1:35 pm
Message reputation : 100% (1 vote)
পুরী ভ্রমণ কথা
প্রথম পর্ব ( ভূমিকা ) -


আবার বেড়ানো | গরমের ছুটিতে এ বছর সিল্করুটের পাহাড়ী বেড়ানোর পর, বছর শেষে শীতকালের ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা সমুদ্রতীরে | গন্তব্য উড়িষ্যার প্রাচীন জনপদ "পুরী" | কলকাতা থেকে প্রায় ৫১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পুরী শুধু সমুদ্র সৈকত নয়, জগন্নাথদেবের মন্দিরের জন্যেও বিখ্যাত তীর্থস্থান। বাঙ্গালীদের সবচেয়ে প্রিয় তিনটে বেড়ানোর জায়গা দীঘা-পুরী-দার্জিলিং । তবে বঙ্গোপসাগরের পশ্চিম তীরে ভারতবর্ষের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত পুরীর মাহাত্ম্য সমুদ্র আর মন্দির দুটোর জন্যই । বহুল জনপ্রিয় বেড়ানোর জায়গা হওয়ার কারনে পুরীর অলিগলি, আনাচে-কানাচে অনেকেরই মুখস্ত | পত্র-পত্রিকা, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, ইন্টারনেট ইত্যাদির সূত্রে পুরীর কুষ্টিঠিকুজি প্রায় সকলেরই নখদর্পনে | আর তাই এবারের ভ্রমনকাহিনী লেখা বেশ চ্যালেঞ্জিং | দেখাই যাক চেনার মাঝে কোনও অচেনার স্বাদ আনা যায় কিনা |

অন্য অনেক বারের তুলনায় এবারের বেড়ানো অনেক পরিকল্পনা প্রসূত | চারমাস আগেই টিকিট কাটা ও হোটেল বুকিং সারা | তা সত্ত্বেও ছোটখাট বিঘ্ন যে আসেনি তা নয় | যেদিন ঠিক চার মাসের উইন্ডো খুলল, সেদিন সকাল সাড়ে আটটায় ইন্টারনেটে টিকিট কেটেও হল ওয়েটিং লিস্ট ৬৪ | সুতরাং ধূপধূনো জ্বেলে আবার প্রচেষ্টা পরের দিন এবং লটারীর টিকিট লাগার মত পুরী এক্সপ্রেসের কনফার্মড টিকিট সকাল আটটা বেজে দুই মিনিটে | চার মাস আগে টিকিট কাটতে গিয়েও আমার মত তথাকথিত শহুরে,কিঞ্চিত প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত মানুষেরই যদি এমন নাজেহাল পরিস্থিতি তবে ভারতের আপামর সাধারন মানুষের হাল সহজেই অনুমেয় | যাই হোক আমার বেয়ারা প্রশ্নের বদভ্যাস সরিয়ে রেখে হোটেলের কথায় আসি | ঠিকই ধরেছেন, আমার ঝটকা লাগা বাকি ছিল | সরাসরি যোগাযোগে বা ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে খোঁজাখুঁজি করে দেখা গেল কোনও হোটেলে ঘর খালি নেই | হ্যাঁ চার মাস আগেই | যে সময়টা আমরা বেছেছি বেড়ানোর জন্য, মানে বড়দিন আর ইংরাজী বছর শেষের দিনগুলি নাকি পুরীতে এরকমই নাভিশ্বাস ওঠে | আর নিশ্চিত করে অধিকাংশ ভ্রমন পিপাসুই বাঙালী |

আমাদের দল এবার একটু ভারী | মানে তিন জনের পরিবর্তে চারজন প্রাপ্তবয়স্ক - আমি, আমার স্ত্রী, মা ও শ্বাশুড়ী মা | সঙ্গে আমার দুটি বাচ্চা - দশ বছরের মেয়ে এবং পাঁচ বছরের ছেলে | সিল্ক রুটের গল্প যাঁরা পডেছেন তাঁরা জানেন যে গত ডিসেম্বরে হঠাৎ করে আমার শ্বশুরমশাই মারা যাবার পর শ্বাশুড়ী মা কিছু মাস হায়দ্রাবাদে দাদার কাছে ছিলেন | ফলতঃ গরমের ছুটির বেড়ানোতে আমরা ওনাকে সঙ্গে পাই নি | এবারের পুরী ভ্রমনের পরিকল্পনা শ্বাশুড়ী মার জন্যেই | ওনার অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল পুরী যাওয়ার | অন্যথায় আমরা বাকীরা ( ছেলে বাদে) আগে পুরী গিয়েছি | আমি আর মা তো একাধিক বার গিয়েছি | আর তাই আমাদের নিজেদের কাছেও চেনা জিনিষ নতুন রূপে খুঁজে পাওয়ার তাগিদ রয়েছে | পারিবারিক, ব্যবসায়িক বহুবিধ কর্মভারে বিপর্যস্ত, প্রযুক্তি নির্ভর অসামাজিক এক ক্ষয়িষ্ণু সময়ে, পরিবারের সকলের সাথে একান্তে কদিনের বেড়ানো অনেকটা বুকভরে শ্বাস নেওয়ার মত |

আর শীতের বেড়ানো বড় মজার | আমার মনে পড়ে ছেলেবেলার কথা | তখন দুর্গাপুজোর সময় থেকেই শীত পড়া শুরু হত | আর ডিসেম্বরে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েই সেশন শেষ | তারপরেই শুরু হত মজা | চিড়িয়াখানা, মিউজিয়াম,তারামন্ডল, ঝিলমিল(এখনকার নিক্কোপার্ক ! ), বইমেলা (তখন বিগ্রেডে হত ),সার্কাস ( বাঘ, সিংহ সহযোগে) তো ছিলই, উপরি মজা ছিল দলবেঁধে বেড়াতে যাওয়া | বাবার বেশ কিছু অফিসের বন্ধুরা পরিবার সহ একসাথে বেড়াতে যাওয়া হত | ভারতের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি সেই দিনগুলোতে আর তাই বেড়ানোর নেশা মিশে গিয়েছে রক্তে সেই ছেলেবেলা থেকেই |

"জল পড়ে, পাতা নড়ে"র মত আমার মাথায় নড়ে পোকা | নিজের ব্যবসা চালু করার পর থেকেই আমার মাথায় ঘোরে আমার মত আরো যারা উদ্যোগপতি তারা মিলে পারিবার সহযোগে যদি বেড়াতে যাওয়া যায় তবে কেমন হয় | নিজস্ব উদ্যোগে ব্যবসা করার জ্বালা-যন্ত্রণা-ভালোলাগা-সাফল্য-আনন্দ-উত্তেজনার রসায়ন আরেকজন উদ্যোগপতি ছাড়া উপলধ্বি করা দুষ্কর নয়, অসম্ভব | ব্যবসার বাইরে নিছক মজায় পরিবার সহযোগে একসাথে বেড়াতে গেলে শুধুই ভাবের আদান প্রদান নয়, পারিবারিক একটা যোগসূত্রও গড়ে ওঠে এই একলা আত্মকেন্দ্রিক সময়ে | কিন্তু তেল-জলে যেমন মিশ যায় না, সেইরকমই এই চলমান সময়ে বাঙালী উদ্যোগপতীদের একসূত্রে বাঁধা কার্যত কুকুরের লেজ সোজা করার মত | মানে "আশায় মরে চাষা" আর কি | এবারের বেড়ানো যেহেতু পূর্ব পরিকল্পিত এবং অনেক সময় হাতে ছিল, আমরা ছাড়াও আরো চারটি পরিবার যোগাড় হল একসাথে যাবার জন্যে | ফলত আমার স্ফূর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ | কিন্তু বেলুন গেল চুপসে কদিনেই | ব্যবসা, ব্যস্ততা , অসুস্থতা, বিয়ে বিভিন্ন বহুল পরিচিত অজুহাতে কেটে গেল সকলেই | সুতরাং আজ যাচ্ছি আমি ও আমার পরিবারই শুধু |

সঙ্গে থাকুন | আগামী কয়েক দিন ঘুরে আসি পুরী থেকে l
"বড়দিনের আড়ম্বরে, পৌষ গিয়েছে চুরি,
ডিসেম্বরের সন্ধ্যারাতে যাত্রা এবার পুরী |
যিশু দিবস - বাড়ছে হুজুগ, হুল্লোড়ে সব মাত,
পান ভোজনে বাংলা ভেসে, নেশার মায়া রাত |
অচেনা ঠেকে আমার শহর, সেও কি আমায় চেনে?
সাগর ডাকে, জগন্নাথও , পালিয়ে যাই ট্রেনে |"


Last edited by ভ্রমন পাখি on Wed Mar 07, 2018 1:55 pm; edited 1 time in total
avatar
Primary
Primary
Posts : 113
Points : 339
Reputation : 3
Join date : 2018-03-05
View user profile

Re: পুরী ভ্রমণ কথা প্রথম পর্ব ( ভূমিকা )

on Wed Mar 07, 2018 1:42 pm
দ্বিতীয় পর্বঃ
২৫ শে ডিসেম্বর, রবিবার বড়দিন | আর তা আরো বড় হয়ে উঠেছে আমাদের কাছে বিশেষত বাচ্চাদের কাছে বেড়াতে যাবার উত্তেজনায় । আজ রাতের পুরী এক্সপ্রেসে আমাদের যাত্রা | গত কয়েক দিন ধরেই বাড়ীতে সাজ সাজ রব । কোন জামাকাপড় নেওয়া হবে, কোন ব্যাগ যাবে, ট্রেনের রাতের খাবারে কি কি নেওয়া হবে ইত্যাদি ইত্যাদি | যেকোন ভাল জিনিসই (যেমন পূজো, বেড়ানো) আসবে আসবে যতক্ষন , ততক্ষনই মধুর , কেননা আসলেই শেষ হয়ে যায় | যাই হোক , শুরুতেই শেষের গান গেয়ে লাভ নেই | ইদানিং ওলা, উবেরও তার ক্যারিশমা দেখাতে শুরু করেছে "সার্জ প্রাইসিং" নামক চালাকির মাধ্যমে | আর বড় দিনের রাতে হাওড়া যেতে বেশী টাকা দিয়েও গাড়ী পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে আমরা সকলেই সন্দিহান ছিলাম | হলুদ ট্যাক্সির মর্জি, ভাড়া নিয়েও বিশেষ ভরসা নেই | ফলে আগে থেকেই গাড়ী বুক করা ছিল | সন্ধ্যা সাতটার সময় স্করপিও গাড়ী হাজির | আমাদের বিশ্বস্ত সারথী গোপাল | অামাদের গাড়ী ভাড়ার দরকার পড়লেই আমরা সবসময় গোপালের দ্বারস্থ | মালপত্র নিয়ে সন্ধ্যা ৯টায় আমরা হাজির হাওড়ায় | ২৩ নম্বর প্ল্যাটফর্ম পুরী এক্সপ্রেসের নির্ধারিত | এত বড় একটা স্টেশন,এত ট্রেনের যাতায়াত, কিন্তু পরিচ্ছনতা, দূরদর্শিতা, পরিকল্পনা ও সদিচ্ছার অভাবের নিদর্শন প্রতি ছত্রে | প্রতিবারই হাওড়া স্টেশনে এলেই আমার এত বিরক্তি হয় যে খুব সামান্য উদ্যোগে, সদিচ্ছায় ( এবং প্রায় কোন অতিরিক্ত বিনিয়োগ ছাড়াই) কেন এই স্টেশন টিকে আন্তর্জাতিক মানের করা যায় না | আমাদের কোন লোয়ার বার্থ পাওয়া যায় নি, ছয়টি বার্থের সবকটিই মিডল বা আপার বার্থ দুজন সিনিওর সিটিজেন ও দুজন বাচ্চা থাকা সত্ত্বেও ( কিরকম সফটওয়ার অ্যানালিটিক কে জানে যেখানে সিনিওর সিটিজেন দের কোন অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা নেই ) I আমাদের সহযাত্রী এক পরিবার যাদের সবকটিই লোয়ার বার্থ ( অল্পবয়স্ক বাবা-মা-মেয়ে) | অন্তত একটি বার্থ পরিবর্তনেও ওঁনাদের কোনও সদিচ্ছা দেখা গেল না | আমরাও আর বেশী অনুরোধ উপরোধের রাস্তায় যাই নি | রাতের খাবারে ছিল বাড়ী থেকে আনা রুটি, কষা মাংস ও মিষ্টি | হঠাৎ করে দেখা হল আমার এক বন্ধুর সাথে | জানা গেল ওঁরাও পরিবার ও আত্মীয় সহ এই ট্রেনেই চলেছে পুরী | ট্রেনের দুলুনি তে সকলেই আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ল | ঘুম ভাঙল যখন ট্রেন ভদ্রক এ | সকাল সাড়ে সাতটায় পুরী স্টেশনে পৌঁছলাম | দরাদরি করে অটো নিয়ে নিউ সী হক হোটেলে পৌঁছলাম ১২০ টাকায় | এটাই স্টেশনের ভিতরে চাইছিল ২০০-২৬০ টাকা । গাড়ী, হোটেল, খাবার যে কোন বিষয়েই "ঝোপ বুঝে কোপ মেরে" পর্যটকের পকেট কাটার যে বহুল ব্যবহৃত কৌশল, পুরীও সেই রোগের বাইরে নয় |

স্টেশন রোড ছেড়ে বাদিকে এগিয়ে মেরিন ড্রাইভ রাস্তায় পড়তেই চোখে পড়ল সামনে বিশাল নীল জলরাশি । সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে বালুরাশিতে। ডান দিকে একে একে পেরোলাম পুরী হোটেল, ভিক্টোরিয়া ক্লাব হাউস, স্বপন পুরী, পুলিন পুরী, সোনালী, সী গাল ইত্যাদি | আরো খানিক এগিয়ে বঙ্গলক্ষ্মীর পাশেই নিউ সী হক | আমাদের বরাদ্দ "মহারানী" রুম | সমুদ্র মুখী সাজানো গোছানো সুইট এর মত রুম | দ্রুত হাতমুখ ধুয়ে প্রাতরাশ সারা হল দুধ চা ও আলুর পরোটা সহযোগে | তারপর বেড়িয়ে পড়লাম স্থানীয় ভ্রমণে | চারশ টাকা চুক্তি তে অটো করে ঘুরে এলাম পিসির বাড়ী, মাসীর বাড়ী, গুরু-শিষ্যের সমাধি মন্দির ( কুলদানন্দ ব্রহ্মচারী ও জটিয়া বাবা ) এবং বুদ্ধ মন্দির | মাসির বাড়ী ও পিসির বাড়ীতে পান্ডাদের যা উপদ্রব, একটু সতর্ক না থাকলেই ঘাড় মটকে ( মানে ভয় দেখিয়ে ) দক্ষিণার নাম করে পয়সা খসিয়ে দেবে | পুরো ব্যারিকেড বানিয়ে, প্রতিটি কাউন্টারে ( বিভিন্ন ঠাকুরের মূর্তি সহযোগে ) ঢুঁ মারতে বাধ্য করিয়ে প্রায় ফাঁদে ফেলার ব্যবসায়িক ষড়যন্ত্র আর কি, ঈশ্বরের নামে | এখানে নানা রকমের দেবদেবী কে নেই -জগন্নাথ,হনুমান,শনি,যম ও অন্যান্য | তার পরেই শুরু ইমোশ্যানাল ব্ল্যাকমেলিং। মূর্তির সামনে মন দিয়ে প্রণাম করতে গিয়ে, চোখের নিমেষে মাথায় হাত ঠেকিয়ে ছুটে আসবে প্রশ্নমালা - নাম, গোত্র, স্ত্রীর নাম ইত্যাদি। তারপরে হতে একটা তাগা বেঁধে দিয়ে ( বিভিন্ন দেব দেবীর কাছে এর রং আলাদা) অথবা ছোটো মূর্তি হাতে গছিয়ে দিয়ে টাকা চাইবে। না দিয়ে কোনও উপায় নেই ।

মাসীর বাড়ীর "মাসী" হলেন দেবী যোগমায়া। পিসী আমাদের বিশেষ পরিচিত পান্ডবদের মা কুন্তী, মহাভারতেও এর উল্লেখ মেলে। মহাভারতে কিছু স্থানে দেখা যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কুন্তীদেবীকে ‘পিসী’ সম্বোধন করতেন । এই পিসী র বাড়িটি অবস্থিত এক বিশাল দিঘীর মধ্যে, নাম নরেন্দ্র সরোবর। জলের মাঝখান দিয়ে যাবার সুন্দর রাস্তা আছে। এখানে জগন্নাথ দেব স্নান করতে আসেন আর মালপোয়া সেবা নেন। এখানেই প্রভুর চন্দনযাত্রা হয় অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে ।

হোটেলে ফিরতে ফিরতে দুপুর একটা | খিদেয় সবারই পেটে ছুঁচোয় ডন-বৈঠক করছে | ঠিক হল আগে পেট পূজো, তারপর সমুদ্রস্নান | ভাত-ডাল-আলুভাজা-স্যালাড-পাঁচ মিশেলী তরকারী - আলু পোস্ত - ভেটকি মাছ সহযোগে আহারের এলাহি আয়োজন আমাদের হোটেলেই | প্রায় তিনটে নাগাদ হিয়া - বাবানের (আমার মেয়ে ও ছেলে) বিশেষ আকর্ষন সমুদ্রস্নান | হোটেলের সামনেই সমুদ্র, ঢেউগুলো ঠিক যেন পরীর মতো। পুরীর বিখ্যাত সোনালী বিচ - সোনালী রঙের বালিতে আচ্ছাদিত। ঘণ্টাখানেকের উপর সমুদ্রে দাপাদাপি, জলকেলি, ছবি তোলা সহযোগে প্রচুর মজা | সমুদ্রের পাড় বাণিজ্যিকরণের চাপে বিপর্যস্ত | প্রচুর স্টল, খাবার-দাবার, জিনিষপত্র বিকিকিনি, নাগরদোলা সহযোগে বিভিন্ন রাইড, ঘোড়া - উট আরো কত কি |

তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে রাতের ঘুম | আগামীকাল খুব সকালে জগন্নাথ দেবের পূজো দিতে হবে |
avatar
Primary
Primary
Posts : 113
Points : 339
Reputation : 3
Join date : 2018-03-05
View user profile

Re: পুরী ভ্রমণ কথা প্রথম পর্ব ( ভূমিকা )

on Wed Mar 07, 2018 1:44 pm
তৃতীয় পর্বঃ
পুরী ভ্রমনের আজ দ্বিতীয় দিন । প্রথমার্ধে পুরী মন্দির, জগন্নাথ দেবের দর্শন ও পূজাপাঠ | আমাদের পূর্বপরিচিত পান্ডার সাথে আগেই কথা বলা ছিল | পরিকল্পনা অনুসারে স্নান সেরে সাড়ে আটটার মধ্যে মন্দিরে পৌঁছলাম | অস্বাভাবিক ভীড় , ঠেলা-গুঁতো পেরিয়ে ভগবানের দর্শন ও পূজা হল |
আজকের জগন্নাথ মন্দিরের স্থানে পুরাকালে একটি স্তূপে বুদ্ধের একটি দন্ত সংরক্ষিত ছিল বলে পুরীর প্রাচীন নাম ‘দন্তপুরা’ – যা পরে শুধু ‘পুরা’ এবং সবশেষে ‘পুরী’তে রূপ নেয়। প্রাচীন কলিঙ্গের রাজধানীও ছিল এই দন্তপুরায়। একসময় দন্তপুরার রাজা বৌদ্ধ-বিদ্বেষী হলে, বুদ্ধানুরাগী রাজকন্যা বুদ্ধের দাঁতটিকে চুলের খোঁপার মধ্যে লুকিয়ে সিংহলে পালিয়ে যান এবং দাঁতটিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন।

প্রাচীন বৌদ্ধ স্তূপের উপর নবম শতকে শঙ্করাচার্য এক মঠ প্রতিষ্ঠা করেন । সেই সময় থেকে এটি সম্পূর্ণ হিন্দু-ধর্মীয় মন্দিরে রূপান্তরিত হয়ে যায়। শঙ্করাচার্য্য অদ্বৈতবাদের প্রবক্তা | মূলত, তিনি এই বিশ্বসত্তাকে অবিভাজ্য এবং এক কল্পনা করেছেন এবং বলেছেন ব্রহ্ম সত্য, এই বিশ্ব মিথ্যা এবং জীবাত্মা ও ব্রহ্ম এক এবং অভিন্ন | এই যে জগৎ প্রত্যক্ষ হচ্ছে যা পরিবর্তনশীল এবং যা নাম ও রূপ এই দুয়ের সমন্বয়ে পরিবর্তিত হচ্ছে, তা ভ্রম মাত্র | এই ভ্রম ব্রহ্মের মায়াশক্তির প্রভাব | অর্থাৎ আমাদের এই ভ্রম বা ভুলের কারণ হল মায়া | এইজন্য এই মতবাদকে মায়াবাদ নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে |

আজকের বৃহৎ মন্দিরটি দ্বাদশ শতকে গঙ্গাবংশীয় রাজা অনন্তবর্মণ কর্তৃক নির্মিত হয়। এ মন্দির নির্মাণের জন্য গঙ্গা হতে গোদাবরী পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল সাম্রাজ্যের ১২ বছরের রাজস্ব সে সময় খরচ করা হয়েছিল। মন্দিরের উচ্চতা ২১৪ ফুট। শ্রী জগন্নাথের বারো মাসের ১৩ যাত্রার মধ্যে রথযাত্রা সর্বশ্রেষ্ঠ। এই রথযাত্রা প্রতিবছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। রথযাত্রা উৎসব এখান থেকেই শুরু । এই মন্দিরে সিংহদ্বার, হস্তীদ্বার, অশ্বদ্বার ও খাঞ্জাদ্বার নামের চারটি প্রবেশপথ আছে । অনেক উঁচু মন্দির। ২০০ ফুটের বেশি হবে। উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। সিংহদ্বারের দুই পাশে দুটি সিংহ পাহারা দিচ্ছে। অন্য দ্বারগুলোতে হাতি, ঘোড়া ও বাঘ বর্তমান। মূল মন্দিরের ভেতরে ছোট ছোট আরো অনেক মন্দির। এখানেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রান্নাঘর । ২০০ কাঠের চুলায় ৪০০ রাঁধুনি প্রতিদিন ১০ হাজার ভক্তের জন্য ৭ মেট্রিক টন চালের ভাত রান্না করেন। এ ছাড়া ১০০ ধরনের ভোগ রান্না করা হয়।

যে রথযাত্রার জন্য পুরীর এত নামডাক, সেটি কিন্তু প্রচলিত হয় শ্রীচৈতন্যদেবের উদ্যোগে। শঙ্করাচার্য্যের ব্রহ্মতত্ত্ব মেনে নিয়েও তিনি বললেন ব্রহ্মের উপরেও একজন আছেন | তিনি পরমব্রহ্ম বা ভগবান কৃষ্ণ | জন্ম নিল দ্বৈতবাদ বা ভক্তিবাদ |

এখানে উল্লেখ্য, বৌদ্ধযুগে বুদ্ধের দন্তোৎসব উদযাপিত হত তিন রথের মিছিল করে। সম্রাট হর্ষবর্ধনের কালে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ভারতে আসেন। তিনি তাঁর ভ্রমণ-বৃত্তান্তে উৎকল ভ্রমণের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, সে সময় উৎকলে ছয় ঘোড়া টানা রথে বুদ্ধ, ধর্ম ও সঙ্ঘের প্রতিকৃতি নিয়ে বৌদ্ধেরা বিহারে বেরুত। তাই অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন আজকের পুরীর রথের জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরাম তারই রূপান্তরিত সংস্করণ।
এবার পুরানের আখ্যানের দিকেও একটু নজর দেওয়া যাক | মালবরাজ ইন্দ্রদুম্ন্য ছিলেন পরম বিষ্ণু ভক্ত। একদিন এক তেজস্বী সন্ন্যাসী তাঁর রাজবাড়ীতে পদার্পণ করলেন। রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য পরম যত্নে সন্ন্যাসীর সেবা যত্ন করলেন এবং পুরুষোত্তম ক্ষেত্রের নীল পর্বতে ভগবান বিষ্ণুর পূজার কথা জানালেন। সেখানে ভগবান বিষ্ণু গুপ্তভাবে শবর দের দ্বারা নীলমাধব রূপে পূজিত হচ্ছেন |

সন্ন্যাসীর কথা শুনে ভগবানের দর্শনে আকুল রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য তাঁর পুরোহিতের ভাই বিদ্যাপতিকে পাঠালেন শবর দের রাজ্যে নীলমাধবের সন্ধানে । শবর দের দেশে রাজা বিশ্বাবসু, বিদ্যাপতিকে স্বাদর অভ্যর্থনা করেন এবং অতিথি সেবার ভার দেন কন্যা ললিতাকে । বিদ্যাপতি ও ললিতা পরস্পরের প্রেমে পড়েন ও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন | বিদ্যাপতি ললিতাকে এর বিনিময়ে নীলমাধব দর্শনের অভিপ্রায় জানান। ললিতা সে কথা শুনে শর্তসাপেক্ষে রাজী হয় | ঠিক হয় বিদ্যাপতি যখন নীলমাধব দর্শনে যাবেন তখন তাঁর দুই চোখে কাপড়ের পট্টি বাঁধা হবে যাতে তিনি রাস্তা না চিনতে পারেন। বিদ্যাপতি রাজি হয়ে যান। কিন্তু বিদ্যাপতি একটি বুদ্ধি করে সঙ্গে করে সরষে নিয়ে যান এবং এক মুঠো করে সরষে নিয়ে সারা রাস্তা ফেলতে ফেলতে যান। বিশ্ববসু কন্যা ললিতার মারফৎ বিদ্যাপতি নীলমাধব কে দর্শন লাভ করলেন বিশ্ববসুর অগোচরে। তারপর বিদ্যাপতি গিয়ে রাজাকে সব জানালেন। রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য খবর পেয়ে সৈন্য সামন্ত নিয়ে নীলমাধবের দর্শনে আসলেন।

কিন্তু পুরুষোত্তম ক্ষেত্রে এসে রাজা শুনলেন নীলমাধব অন্তর্ধান হয়েছেন। মতান্তরে শবর রাজ বিশ্বাবসু সেটিকে লুকিয়ে রাখেন। রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য এতে খুব দুঃখ পেয়ে অনশনে প্রান ত্যাগ করাই শ্রেয় মনে করলেন । সেসময় দেবর্ষি নারদ মুনি রাজাকে আত্মাহুতি থেকে বিরত করেন এবং জানান পিতা ব্রহ্মার সন্দেশ - যে এই স্থানে ভগবান জগন্নাথ দেব দারুব্রহ্ম রূপে পূজা পাবেন। রাজা শুনে শান্তি পেলেন। এক রাতে রাজা শয়নে ভগবান বিষ্ণুর স্বপ্ন পেলেন।
স্বপ্নাদেশ অনুসারে পুরীর বাঙ্কিমুহান নামক স্থানে গিয়ে দারুব্রহ্মের সন্ধান পাওয়া গেল । কিন্তু রাজাতো কোন ছার, রাজার সহস্র হাতী টেনেও সেই দারুব্রহ্মকে এক চুলও নড়াতে পারলো না। হতাশ রাজন আবার স্বপ্নাদেশ পেলেন পরম ভক্ত শবর রাজ বিশ্বাবসুকে সসম্মানে এইস্থানে নিয়ে আসার ও একটি স্বর্ণরথ আনার |
রাজা সেই মতো কাজ করলেন। বিশ্বাবসু, বিদ্যাপতি আর রাজা তিনজনে মিলে দারুব্রহ্ম তুললেন ও রথে বসিয়ে নিয়ে এলেন।

প্রচারিত যে পুরীর দৈতাপতিরা ওই ব্রাহ্মণ বিদ্যাপতি এবং শবর কন্যা ললিতার বংশধর। তাই ওরা কেবল রথের সময় ভগবান জগন্নাথের সেবা করার অধিকার পান। রথে উপবিষ্ট প্রভু জগন্নাথ বলভদ্র মা সুভদ্রা এবং সুদর্শনের।

রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য সমুদ্রে প্রাপ্ত দারুব্রহ্ম প্রাপ্তির পর গুণ্ডিচা মন্দিরে মহাবেদী নির্মাণ করে যজ্ঞ করলেন। যজ্ঞ সমাপ্তে দেবর্ষি নারদ মুনির পরামর্শে রাজা সেই দারুব্রহ্ম বৃক্ষ কাটিয়ে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা দেবীর বিগ্রহ তৈরীতে মনোনিবেশ করলেন। এর জন্য অনেক ছুতোর কারিগর কে ডেকে পাঠানো হোলো। কিন্তু বৃক্ষের গায়ে হাতুড়ী, ছেনি ইত্যাদি ঠেকানো মাত্রই যন্ত্র গুলি চূর্ণ হতে লাগলো। সেসময় ছদ্দবেশে বিশ্বকর্মা মতান্তরে ভগবান বিষ্ণু এক ছুতোরের বেশে এসে মূর্তি তৈরীতে সম্মত হলেন। দাবী জানালেন একটি বড় ঘর ও ২১ দিন সময় । আর শর্ত হল ২১ দিন দরজা বন্ধ করে কাজ হবে । সেসময় এই ঘরে যেন কেউ না আসে। কেউ যেন দরজা না খোলে।

ছদ্দবেশী বিশ্বকর্মা ঘরে ঢুকলে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে সেখানে কড়া প্রহরা বসানো হোলো যাতে কাক-পক্ষীও গলতে না পারে। ভেতরে কাজ চলতে লাগলো। কিন্তু রানী গুণ্ডিচার মন মানে না। স্বভাবে নারীজাতির মন চঞ্চলা | অনুসন্ধিৎসায় মহারানী ১৪ দিনের মাথায়, মতান্তরে ৯ দিনের মাথায় দরজা খুলে দিলেন। কারিগর ক্রুদ্ধ হয়ে অদৃশ্য হোলো। অসম্পূর্ণ জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা দেবীর মূর্তি দেখে রানী ভিরমি খেলেন। রাজার কানে খবর গেলো এবং রানী খুব তিরস্কৃত হলেন । বিষ্ণু ভক্ত রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য তাঁর আরাধ্য হরির এই রূপ দেখে দুঃখিত হলেন এবং রাত্রে আবার স্বপ্নাদেশ পেলেন | শর্ত ভঙ্গ হওয়াতে তৈরী এই অসম্পূর্ণ মূর্তিতেই ভগবান বিষ্ণু তাঁর পরম ভক্তের কাছ থেকে পূজা গ্রহনে সম্মত । দারুব্রহ্ম রূপে পুরুষোত্তম ক্ষেত্রে হবে তাঁর নিত্য অবস্থান । তিনি প্রাকৃত হস্তপদ রহিত, কিন্তু অপ্রাকৃত হস্তপদাদির দ্বারা ভক্তের সেবাপূজা শ্রদ্ধা গ্রহণ করবেন । সেই থেকে উল্টো রথের পর একাদশীর দিন তিন ঠাকুরের সুবর্ণ-বেশ রথের ওপর হয়। সেই বেশ দেখলে সাত জন্মের পাপ ক্ষয় হয় যা দেখতে লক্ষ লক্ষ ভক্ত পুরী আসেন প্রত্যেক বৎসর।

আজকের পর্ব এখানেই শেষ | অপরাহ্নের কোনারকের গল্প পরের পর্বে |
avatar
Primary
Primary
Posts : 113
Points : 339
Reputation : 3
Join date : 2018-03-05
View user profile

Re: পুরী ভ্রমণ কথা প্রথম পর্ব ( ভূমিকা )

on Wed Mar 07, 2018 3:18 pm
চতুর্থ পর্ব :
পুরাণ, ইতিহাস ও গল্পের রোমন্থনে বাকি কোন কথাই হয় নি আগের পর্বে | পুরীর সমস্ত বিষয়ই প্রবল পারিমানে বাণিজ্যিক তা সে গাড়ী, খাবার, হোটেল, কেনাকাটা হোক কিংবা পূজো | প্রবল পরিমানে দালাল দ্বারা চালিত এবং "অতিথি দেব ভব" ভাবধারার কোনও চিহ্ন মাত্র নাই | আমাদের হোটেলে যেমন সবসময় তিনজন পান্ডা ঘুরে বেড়াচ্ছে কাষ্টমার ধরার জন্যে (মুরগী ধরাও বলা যেতে পারে) | যাই হোক মন্দিরের কথায় আসি | প্রচুর অব্যবস্থা ও সুপরিকল্পিতভাবে ভীড় ও ঠেলাঠেলির পরিবেশ তৈরী করে রাখা, যাতে বেশ কষ্ট করেই পান্ডা সহচর্যে এক পলকের বেশী ভগবানের দর্শন না করা যায় | কথায় বলে "বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর" | এই বহুল প্রচারিত তত্ত্বের উপর ভর করে , ভক্তকুলের অগাধ আস্থায় ও অঢেল দানে রমরমিয়ে চলছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ রান্নাঘর | কিন্তু তার পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা গুণমান নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট কারণ আছে। কট্টরপন্থীরা আমায় নাস্তিক ভাবতে পারেন, কিন্তু শুধুই অর্থ মুখী চিন্তা ভাবনায়, সে পূজার আকুতি ভগবানের কাছে পৌঁছতেই পারে না |

সবচেয়ে আশ্চর্য্য ঘটনা খুলে বলি | আমরা তখন মন্দিরের একঘরে বসে | কোন প্যাকেজের ( হ্যাঁ, প্যাকেজ ! ) পূজো দেওয়া হবে তা নিয়ে আলোচনা চলছে "রেট চার্ট" অনুসারে | ইতিমধ্যে দেখি পাশের বারান্দায় কিছু ভক্ত কলাপাতায় অন্নভোগ প্রসাদ নিচ্ছেন | অনেকেই অনেক কিছু খেলেন না এবং পাতে অবিন্যস্ত উচ্ছিষ্ট পড়ে রইল | কি আশ্চর্য্য , পরিবেশক অবশিষ্ট খাদ্য (উচ্ছিষ্ট) গুছিয়ে রাখতে শুরু করলেন | অন্নভোক্তাদের মুখ হাঁ বিস্ময়ে | প্রশ্নের উত্তরে স্বতঃস্ফূর্ত জবাব এল যে "ভগবানের প্রসাদ ফেলতে নেই, তা উচ্ছিষ্ট বা খারাপ হয় না" | প্রমাণস্বরূপ পরিবেশক কিছুটা উচ্ছিষ্ট নিজেই খেয়ে দেখালেন এবং বাকি খাবার অতি যত্নে সংরক্ষিত করলেন | সবচেয়ে আশ্চর্য যাঁরা অন্ন গ্রহণ করছিলেন তাঁদেরও বিস্ময় ঘুচে গিয়ে সন্তুষ্টই মনে হল | ভগবানের অপার মহিমা |

দু-চার কথা ছন্দে বলার লোভ সামলাতে পারলাম না :
"সব রাস্তা মিলছে সটান পুরীর ধামে এসে,
ভক্ত আকুল, হৃদয় ব্যাকুল, জগন্নাথের দেশে |
নষ্ট ভীড়ে, পান্ডা ঘিরে, তোমার দেখা পায়না,
ইতিহাসে নজর রেখো, পুরানই তার আয়না |
বুদ্ধ স্তুপে, হিন্দু রূপে, ধর্মে বহাল খুঁটি ,
রথের চাকা, উড়ছে টাকা, ভন্ড জনের জুটি |
কিন্তু তবু ভরসা রেখো গৌতমে আর জগন্নাথে,
আমিই ব্রহ্ম, তুমিই পরম, জুড়েই আছি সাথে |"

যাই হোক হোটেলে ফিরতে ফিরতে দুপুর বারোটা | লাঞ্চ করে একটা নাগাদ বেরোলাম কোনারকের উদ্যেশ্যে | অটোওয়ালার সাথে সাতশ টাকার চুক্তি | কোনারক পৌঁছে টিকেট কেটে ( জনপ্রতি তিরিশ টাকা হিসেবে ) ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে রোদ পড়ে এল | গাইড ঠিক হল একশ টাকায়, ভিতরে ঢোকার পর (বাইরে গাইড চাইছিল ৩৫০ টাকা) |

উড়িষ্যার কোনারকের এই সূর্য মন্দিরকে অপূর্ব স্থাপত্যশৈলী ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের জন্য ইউনেস্কো বিশ্ব সভ্যতার একটি উত্তরাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে । এয়োদশ শতকে পূর্ব-গঙ্গা রাজ্যের অধিপতি মহারাজ নরসিংহ দেব সূর্য দেবতার আরাধনার জন্য এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন । এই মন্দির তার অভিনব আকার, বিশালত্ব আর কারুকার্যের জন্য প্রসিদ্ধ। তামিল শব্দ "কোণ" আর সংস্কৃত শব্দ "অর্ক" মিলে কোনার্ক শব্দটির সৃষ্টি । "কোণ" মানে "Angle" আর "অর্ক" মানে সূর্য | সূর্যের বিভিন্ন কোণ বা অবস্থান সময়ের বিন্যাস ফুটে উঠেছে এই মন্দিরে | ওড়িয়া ও দ্রাবিড় স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণে নির্মিত মন্দিরটি ধূসর বেলে পাথরে বিশাল একটি রথের আকারে গড়া । সমুদ্র থেকে উঠে আসা সূর্যদেবের বিশাল রথ, তার সামনে রয়েছে সাত জোড়া ঘোড়া । বারো জোড়া বিশাল চাকার ওপর পুরো মন্দিরটি নির্মিত । প্রতিটি চাকা একেকটি সূর্যঘড়ি । চাকার ভেতরের দাঁড়গুলো সূর্যঘড়ির সময়ের কাঁটা । কলিঙ্গ স্থাপত্যের রীতি অনুযায়ী কোনারক মন্দিরের চারটি অংশ-ভোগমন্ডপ, নাটমন্দির, জগমোহন ও দেউল।

রথের দুটি অংশ - মূল অংশ অর্থাৎ যেখানে রথী বসেন, তা হল বড়দেউল। আর সারথির অংশটাই জগমোহন। সূর্যের এই রথের মোট ৭টি অশ্ব- সপ্তাহের সাতবার নির্দেশ করে। একেকদিকে ১২টি করে মোট চব্বিশটি চক্র। একএকটি চক্র এক এক পক্ষকাল। চক্রগুলি মোটামুটি একই রকম, যদিও কারুকাজে তফাত আছে। রথচক্রগুলিতে আটটি বড় স্পোক এবং আটটি ছোট স্পোক আছে। বড় স্পোকগুলির মাঝে মোট আটটি এবং চক্রের মাঝে একটি গোলাকার অংশ রয়েছে। তাতে স্ত্রী, পুরুষ, মিথুনচিত্র, দেবদেবীর মূর্তি খোদিত রয়েছে। এখনো নিখুঁতভাবে সময় জানা যায় এই সূর্যঘড়ির সাহায্যে । মন্দিরের প্রবেশ পথেই রয়েছে বিশাল দুটি সিংহের মূর্তি যারা লড়াই করছে দুটি রণহস্তীর সঙ্গে । মন্দিরের বেদী থেকে শুরু করে চূড়া পর্যন্ত প্রতি ইঞ্চি জায়গায় পাথরের ভাস্কর্য ও কারুকার্য রয়েছে l দেবতা,অপ্সরা,কিন্নর,যক্ষ,গন্ধর্ব,নাগ,মানুষ,বিভিন্ন প্রাণী,পৌরাণিক বিভিন্ন ঘটনার প্রতিরূপ,নৃত্যরত নরনারী,প্রেমিক যুগল,রাজদরবারের বিভিন্ন দৃশ্য,শিকারের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে পাথরের বুকে । মূর্তিগুলোর মানবিক আবেদন,নিখুঁত গড়ন,লীলায়িত ভঙ্গী শিল্পকলার চরম উৎকর্ষের নিদর্শন ।

বড় দেউলের তিনদিকে সূর্যদেবের তিন মূর্তি - দক্ষিণে দন্ডায়মান পূষা, পশ্চিমে দন্ডায়মান সূর্যদেব ও উত্তরে অশ্বপৃষ্ঠে হরিদশ্ব। জগমোহনের পূর্বদ্বারের সামনে ছিল একটি ধ্বজস্তম্ভ। তার শীর্ষে ছিল সূর্যসারথি অরুণের মূর্তি। এই মূর্তিটি এখন পুরীর মন্দিরে আছে।
জগমোহনের তিন দরজার সামনে সিঁড়ির কাছে ও মন্দিরের চত্ত্বরের ভিতরেই প্রকান্ড পাদপীঠের ওপর রয়েছে তিনজোড়া বিশালকায় মূর্তি। উত্তর দরজার দিকে দুটি হাতী , দক্ষিণদরজায় দুটি ঘোড়া এবং পূর্বদরজায় দুটি বাঘ ।

মূল মন্দিরের দক্ষিণ-পশ্চিমে সূর্যপত্নী মায়াদেবীর মন্দির।

মন্দিরে সূর্যদেবতার যে বিশাল বিগ্রহ ছিল তা এখন নেই ।কালের করাল গ্রাসে স্থাপনার অনেকটাই আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত । পুরুষোত্তম দেবের পুত্র নরশিমা দেব সূর্যদেবের বিগ্রহটি পুরীর জগন্নাথের মন্দিরে নিয়ে যান । শুধু বিগ্রহই নয়, কারুকার্য করা অনেক পাথরও তাঁর আমলে ও মারাঠা শাসনকালে পুরীর মন্দিরে স্থানান্তরিত হয় । পর্তুগীজ আক্রমণের ফলে মূল মন্দিরের চুম্বক বিনষ্ট ও ধ্বংস হয় | ইতিহাস , স্থাপত্য শৈলি এবং সুপ্রাচীন কারিগরী কৌশলের জাদুদন্ডে এক লহমায় চলে গিয়ে ছিলাম অতীতে | মুগ্ধ বিস্ময়ে কোথা থেকে সময় কেটে গেল, বুঝতেই পারলাম না |

সন্ধ্যে ছুঁই-ছুঁই | ফেরার পথে খানিক গল্প হল সমুদ্রের সাথে চন্দ্রভাগা বীচ এ | পুরীর শহুরে বস্তুকেন্দ্রিক মালিন্য, বানিজ্যিক মোহ, হুজুগে ভীড় এখনো হামলে পড়েনি এখানে | সমুদ্রের অপার বিস্তার, ঢেউয়ের ভাঙ্গা গড়ার মাঝে নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার সুযোগ আছে | কিন্তু আর কদিন? মানুষ আসছে হুড়মুড়িয়ে, সামলে থেকো সমুদ্র |
avatar
Primary
Primary
Posts : 113
Points : 339
Reputation : 3
Join date : 2018-03-05
View user profile

Re: পুরী ভ্রমণ কথা প্রথম পর্ব ( ভূমিকা )

on Wed Mar 07, 2018 3:20 pm
পঞ্চম পর্বঃ
আজ তৃতীয় দিন চিল্কা ভ্রমণ | পুরী থেকে প্রায় এক ঘণ্টার দূরত্বে |

ভারতের বৃহত্তম উপকূলবর্তী লবনাক্ত হ্রদ চিল্কা। প্রায় ৫২ টি নদী এই হ্রদে এসে মিশেছে। এটি ভারতের বৃহত্তম এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম লেগুন। আয়তন ১০০০ বর্গ কিমি , বর্ষায় পরিধি বিস্তৃত হয়ে ১১৭০ বর্গ কিমি | আকার অনেকটা নাশপাতি ফলের মত | ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে পরিযায়ী পাখিদের বৃহত্তম ঠিকানা হল চিল্কা । এখানে প্রায় ১৬০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি আসে । ভারতের জীব বৈচিত্রের অন্যতম অঞ্চল চিল্কা হ্রদকে পরিযায়ী পাখিদের অন্যতম গন্তব্যস্থল হিসেবে , বিশ্বের আরও সাতটি অঞ্চলের সঙ্গে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে চিল্কা। প্রকান্ড চিল্কা লেকের মাঝে জেগে রয়েছে বেশ কিছু দ্বীপ যেমন সাতপাড়া, নলবন, কালীযাই ইত্যাদি | সমস্ত দ্বীপ মিলিয়ে প্রায় দেড় লক্ষ মৎসজীবীর বাস | কোনও দ্বীপের খ্যাতি হিন্দু মন্দিরের জন্য , কোথাও তৈরী হয়েছে পক্ষীনিবাস , কোথাও আবার গড়ে উঠেছে ডলফিন গবেষণা কেন্দ্র |

আমরা পৌঁছলাম ম্যাজিক গাড়ী করে সাড়ে এগারোটা নাগাদ চিল্কার তীরে । সাড়ে তিনঘণ্টার নৌকা বিহারের টিকিট কেটে প্রথমেই পাশের হোটেলে খাবার অর্ডার করে দেওয়া হল যাতে ফিরতে ফিরতে খাবার তৈরী হয়ে থাকে | খাবার না বলে রাক্ষসের খাবার বলাই ভাল | কি না অর্ডার দেওয়া হল | ভাত-ডাল-ফুলক পির তরকারি, স্যালাড , আলুভাজা বাদই দিলাম | সঙ্গে পারসে মাছ, বাগদা চিংড়ী ও কাঁকড়া |

এরপর শুরু হল ভেসে চলা | দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি , নীল আকাশ, ইতিউতি উড়ে বেড়াচ্ছে পারিযায়ী পাখি , আর আমরা যেন অনন্তের যাত্রী | খালি মোটর বোটের গগন বিদারী আওয়াজ এ অপার্থিব পরিবেশের সাথে বড়ই বেমানান | আর চারপাশে চড়ে বেড়াচ্ছে এরকমই অগুনতি জলযান | সকলেরই প্রাথমিক উদ্দেশ্য "ডলফিন শিকার" | হ্যাঁ , একটু অতিশয়ক্তি হল হয়ত, তবে এ শিকার মানে হত্যা নয়, ডলফিন দর্শনের অভিজ্ঞতা শিকার | কিন্তু এত যান্ত্রিক শব্দ ব্রহ্মের মাঝে ডলফিন এর কি দায় নিজেকে প্রকাশ করার | তাই তারা "এই তো আমি এখানে" সূচক কানামাছি খেলার মত লেজ, মাথা, পাখনা দেখিয়েই পর্যটক দের উসকে দেয় | যদিও জনগণ "আমরা তো অল্পে খুশী" র ঢঙে বিপুল উচ্ছ্বাসে পটাপট সেই শিকার করা "দৃশ্য" মনবন্দী করার চেয়ে "ফ্রেমবন্দী"তেই ( মোবাইল বা ক্যামেরায়) বেশী মনোযোগী হয়ে পড়ে | এরপরেই মাঝদরিয়ার নৌকা চালকের কৌশল, আরেকটু অন্য দিকে ভিতরে গেলেই ভেসে উঠবে পাখীদের সাম্রাজ্য, যদিও তাতে "সামান্য কিছু এক্সট্রা" খরচ লাগবে | আমরা এই "আরেকটু"র ফাঁদে মোহগ্রস্ত না হওয়ায় মোটরচালক যথারীতি হতাশ | খানিক পরে একটা দ্বীপে নোঙর করা হল যেখানে চিল্কা গিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে | ফলে বালীয়ারীর একদিকে হ্রদ আর অন্য দিকে সমুদ্র | ইতিউতি ঝুপড়ি দোকান | কোথাও ডাব, মাছ ভাজা , চা , ভাত, ম্যাগী ইত্যাদি | পাত্রে রাখা জ্যান্ত মাছ , কাঁকড়া | সেখান থেকে আমরা বেছে নিলাম ১০টি বাগদা চিংড়ী | পরিষ্কার করে , তেল-নুন- পিয়াজ-মসালা সহযোেগে ভাজা ভাজা করতে বলা হল | সব মিলিয়ে খরচ ২৫০ টাকা | ঠিক হল আমরা দ্বীপের অন্যপাড় ( সমুদ্রপাড়) থেকে ঘুরে আসতে আসতই ভাজা তৈরী থাকবে | অন্য দিকে সমুদ্রতীরে ইতস্তত ঘোরাঘুরি , লাল কাঁকড়ার খোঁজ , আর শাঁসালো ভাবের মিষ্টি জলে গলা ভেজানো | আর এখানে বসেই মনে পড়ল আমার কৈশোরে পড়া ও আবৃত্তি করা বুদ্ধদেব বসুর অমর ক বিতা "চিল্কায় সকাল" :

''কী ভালো আমার লাগলো আজ এই সকালবেলায়
কেমন করে বলি?
কী নির্মল নীল এই আকাশ, কী অসহ্য সুন্দর,
যেন গুণীর কণ্ঠের অবাধ উন্মুক্ত তান
দিগন্ত থেকে দিগন্তে;
কী ভালো আমার লাগলো এই আকাশের দিকে তাকিয়ে;
চারদিক সবুজ পাহাড়ে আঁকাবাঁকা, কুয়াশায় ধোঁয়াটে,
মাঝখানে চিল্কা উঠছে ঝিলকিয়ে।
তুমি কাছে এলে, একটু বসলে, তারপর গেলে ওদিকে,
স্টেশনে গাড়ি এসে দাড়িয়েঁছে, তা-ই দেখতে।
গাড়ি চ’লে গেল!- কী ভালো তোমাকে বাসি,
কেমন করে বলি?
আকাশে সূর্যের বন্যা, তাকানো যায়না।
গোরুগুলো একমনে ঘাস ছিঁড়ছে, কী শান্ত!
-তুমি কি কখনো ভেবেছিলে এই হ্রদের ধারে এসে আমরা পাবো
যা এতদিন পাইনি?
রূপোলি জল শুয়ে-শুয়ে স্বপ্ন দেখছে; সমস্ত আকাশ
নীলের স্রোতে ঝরে পড়ছে তার বুকের উপর
সূর্যের চুম্বনে।-এখানে জ্ব’লে উঠবে অপরূপ ইন্দ্রধণু
তোমার আর আমার রক্তের সমুদ্রকে ঘিরে
কখনো কি ভেবেছিলে?
কাল চিল্কায় নৌকোয় যেতে-যেতে আমরা দেখেছিলাম
দুটো প্রজাপতি কতদূর থেকে উড়ে আসছে
জলের উপর দিয়ে।- কী দুঃসাহস! তুমি হেসেছিলে আর আমার
কী ভালো লেগেছিল।
তোমার সেই উজ্জ্বল অপরূপ মুখ। দ্যাখো, দ্যাখো,
কেমন নীল এই আকাশ-আর তোমার চোখে
কাঁপছে কত আকাশ, কত মৃত্যু, কত নতুন জন্ম
কেমন করে বলি।"
avatar
Primary
Primary
Posts : 113
Points : 339
Reputation : 3
Join date : 2018-03-05
View user profile

Re: পুরী ভ্রমণ কথা প্রথম পর্ব ( ভূমিকা )

on Wed Mar 07, 2018 3:22 pm
ষষ্ঠ পর্বঃ
পুরীতে আজ চতুর্থ দিন | প্রথমে ঠিক ছিল আজকে নন্দনকানন ঘুরে এসে ৩o ডিসেম্বর (শুক্রবার) বিশ্রাম নেওয়া হবে যেহেতু ৩১শে ডিসেম্বর (শনিবার) আমাদের ফেরা | কিন্তু গত দুদিন ঘোরাঘুরি তে পরিবারের সকলেই ক্লান্ত হওয়ায় আজকেই ( ২৯শে ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার) বিশ্রাম মনস্থ হল |

ফলতঃ আজ কোনও প্ল্যান নেই, যা খুশী করা যেতে পারে | প্রথম পদক্ষেপে দেরীতে ঘুম থেকে ওঠা | আলুর পরোটা, চা, ওমলেট সহযোগে প্রাতরাশ সাড়া হল সকাল সাড়ে দশটায় | তারপরে পারিবারিক "বস্তু সংগ্রহে"র অভিযান | বোঝা গেল না? একটু পরিষ্কার করি | "বস্তু সংগ্রহ" শব্দটি আমার এক বন্ধুর থেকে ধার করা | "নিজস্বী" (সেলফি), মোবাইলে ছবি তোলা ও গান শোনা, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের মত বেশ কিছু আধুনিক নেশার মতন একটি গুরুতর রোগ হল "কেনাকাটা" | সে বাড়ীর এলাকাতেই হোক বা বেড়াতে গিয়েই হোক , হামলে পড়ে "বস্তু সংগ্রহ" যে কোন মূল্যে, যা খুশী ( বিশেষ সংগ্রহযোগ্য জিনিস নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সস্তায় রদ্দি জিনিষ, চৈনিক সর্বত্র পাওয়া যায় এমন জিনিস) আজকের সামাজিক পরিকাঠামোর ও মানব মননের এক অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য | যাই হোক আজকের সকাল সেই কেনাকাটায় বরাদ্দ |

অপ্রাসঙ্গিক জিনিস বাদ দিয়ে কিছু বিশেষ জিনিসের বা বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করি যা পুরীর বৈশিষ্ট্য বহন করে -

হাঁড়ি :
অ্যালুমিনিয়ামের বাসন (উজ্জল সাদার ওপর ফোঁটা ফোঁটা টিপের মত দাগ দেওয়া), বিশেষত হাঁড়ি পুরীর একটি বিশেষ জিনিস | জগন্নাথ দেবের রান্নাঘরের হাঁড়ি থেকেই হয়তো হাঁড়ি কেনার হিড়িক | আগেকার দিনে যেই পুরী যেতো সেই হাঁড়ি কিনতো। তখন যৌথ পরিবারের কাল, হাঁড়ির দরকারও পড়তো গেরস্তবাড়িতে। আজকাল বিভিন্ন ধরনের / মাপের হাঁড়ির ( বিশেষতঃ বড় হাঁড়ি) প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে | পুরীর মন্দিরের চারপাশের বিভিন্ন দোকান, স্বর্গদ্বারের প্রায় প্রতিটি দোকানে এবং সমুদ্র তীরবর্তী প্রচুর দোকানে এখনও তা পাওয়া যায় |

লাঠি :
এ লাঠি একটু অন্যরকম | সরু সরু হেঁতালের ডাল, বিভিন্ন রঙ দিয়ে পালিশ করা ছোট-বড় বিভিন্ন মাপের লাঠি | জগন্নাথের মন্দিরের ঝাঁটার ব্যবহারের পরিবর্তিত রূপে দুটি ছোট লাঠি দিয়ে মাথায় টোকা দিয়ে আশীর্ব্বাদ করার প্রথা থেকেই বোধ হয় এই লাঠি কেনার ধূম | কিছুকাল আগেও বর্ষীয়ানরা পুরী গেলে কচিকাঁচাদের জন্য নিয়ে আসতেন। তখনকার যৌথ পরিবারগুলিতে অনেক বাচ্চা থাকত | তাদের পেটাতে ও মারপিটে চমৎকার ভূমিকা নিতো হেঁতালের লাঠিগুলি। যৌথ পরিবার অবলুপ্ত, পরিবার পিছু বাচ্চাও এখন হাতে গোনা, তার ওপর পিতামাতার সদাসতর্ক উদ্বিগ্ন নজর | সেই দুঃখেই বোধহয় পুরীর লাঠি বাজার অবলুপ্তির পথে |

খাজা:
জগন্নাথ দেবের ছাপ্পান্ন ভোগের অন্যতম খাজা , যা কিনা আদতে একটি শুকনো ভাজা মিষ্টি | অাটা / ময়দা দিয়ে বানিয়ে তাকে ভেজে ( তেল বা ঘিয়ে) গরম মিষ্টি চিনির রসে ফেলে বানানো মিষ্টি | তবে যত সহজে লিখলাম পদ্ধতিটি এত সহজ হলেও বিভিন্ন দ্রব্যর পরিমাপ , মিশ্রন, ভাজার/ রসে ফেলার সময় , রসের ঘনত্ব ইত্যাদি অনেক বিষয়ের উপরেই খাজার গুনাগুন নির্ভর করে | পুরির প্রতিটি অলি-গলিতে, মিষ্টির দোকানে, ফুটপাতে আর কিছু না পেলেও খাজা মিলবেই | এই একটি বিষয়ের চাহিদা ক্রমবর্ধমান | আর এখানেই সকল কে টেক্কা মেরে এক টি ব্র্যান্ড হয়ে উঠেছে "কাকাতুয়া" | স্বর্গদ্বারের শ্বশানের ঠিক পিছনেই দোকান , সামনে খাঁচায় একটি কাকাতুয়া পাখী | আর দোকানের সামনে বুভুক্ষ জনতা লাইনে | ৫০০ গ্রাম ও ১ কেজির প্যাকেট থরে থরে সাজানো এবং নিমেষে কেজি কেজি উড়ে যাচ্ছে | লোকাল লোকজনের সাথে কথা বলে জানলাম কাকাতুয়ার খাজার মান পড়তির দিকে, শুধুই ভারে কাটে এখন | যারা সত্যিই গুণমান সম্বন্ধে সচেতন এবং স্বরাখবর রাখেন তাঁরা পুরী মন্দিরের সামনে নরসিংহ সুইটস ছেড়ে অন্য কোথাও পাও মাড়াবেন না | দামে একটু বেশী, তবে স্বাদ সত্যিই অতুলনীয় | কেজিতে ১০০ টাকা থেকে ১৮o টাকা অবধি দাম বৈশিষ্ট্যের বিচারে |

গামছা :
অনেকেই হাসবেন যে গামছা কি করে বিশেষ জিনিস হতে পারে | কিন্তু এত বড়, পোক্ত, চওড়া গামছা আর কোথাও পাওয়া যায় বলে আমার জানা নেই | কারণ জানি না ঠিক | গেরুয়া রঙের গামছাগুলো মোটামুটি ছোট একটা শাড়ী | ৯০-১২০ টাকা দাম গুনমান অনুসারে | এছাড়া অন্য রঙ ও কারুকাজের গামছা ও আছে , তবে অত বড় নয় |

কটকী কাপড়:
কটকী মানে কটক জাত | সুতীর কাপড়ে কিরিকিরি কাজ করা, বোনা বা প্রিন্টেড লুঙ্গী - জামা - ফতুয়া - গেঞ্জী - পাঞ্জাবী - শাড়ী ইত্যাদি | এ জিনিস আজকাল সবজায়গায় পাওয়া গেলেও , উৎসস্থলে এর উৎকর্ষ ভাল হওয়ার সম্ভাবনা |

কাগুজে বাঘ :
কাগজের মন্ডের বাঘ, হাওয়ায় যার মাথা নড়ত। এটাও পুরীর একটা বিশেষ জিনিস ছিল, অনেকেই স্মৃতি হিসেবে কিনে নিয়ে যেত | এবার প্রায় কোথাও এই জিনিস টি দেখলাম না |


সী বীচ :
সোনালী বালির সৈকতে সারি সারি প্লাস্টিকের চেয়ার পাতা | চা-বিস্কুট বা ডাবের জলের পরিষেবা নিলে বসা ফ্রি | নচেৎ দশটাকা প্রতি চেয়ার ভাড়া | অারেকটু আরামদায়ক হেলানো চেয়ার পেতে গেলে ঘণ্টায় কুড়ি টাকা | ঢেউ ভাঙছে এসে পায়ের কাছে | ফেনিল দুধসাদা ভাঙা ঢেউ আরও মোহময়ী রাত্রে চাঁদের আলোয় ৷ ঘোড়া উট এর পাশাপাশি চা-বিস্কুট, মাছভাজা, ফুচকা, চপ-সিঙ্গারা, বাদাম ভাজা, ঝালমুড়ী, ভেলপুরি, চাউমিন, ধোসা, ঘুগনি, আইসক্রীম - মানে যতরকম খাবারের অপশন থাকা সম্ভব - সারা ভারত এক সমুদ্র সৈকতে । কাঠের খেলনা, শঙ্খ, ঝিনুক, নানাবিধ চৈনিক প্লাস্টিকের সামগ্রী | ফিসফিসিয়ে কানের কাছে আসলি মুক্তোর মালার গোপন খবর। জামাকাপড়, ব্যাগ, মেলার রাইড কি নেই | স্যান্ড আর্ট আছে | একান্তে পানীয় সেবন আছে | পাজামা, বারমুডা, গামছা, স্ল্যাক্স পরিহিত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রৌদ্রস্নাত সমুদ্রস্নান সহ উচ্ছ্বল জলকেলি। মাঝে মাঝে হঠাৎ ঢেউয়ের ধাক্কায় নাকে মুখে জল ঢুকে যাওয়া অপ্রুস্তত শিশুর খিলখিলিয়ে ওঠা হাসি। ভোর বেলা নৌকা করে ধরে আনা জ্যান্ত মাছ, কাঁকড়া | সঙ্গে সূর্যোদয়, সূর্যাস্তের অপার্থিব মুগ্ধতা | সকাল, সন্ধ্যা সমুদ্রের পারে বসেই কেটে যেতে পারে কত অলস বেলা | সমুদ্রতীরে এত বস্তুগত ঘনঘটা আমার মত বুড়োটে লোকের পছন্দ না হলেও এরকম সম্পূর্ণতা অন্য কোন বীচে আমার চোখে পড়েনি |

গড়িয়ে গড়িয়ে, বাচ্চাদের সাথে সমুদ্রে স্নান, খেলাধূলা, খাওয়া-দাওয়া এভাবেই কেটে গেল আজ সারাদিন |
avatar
Primary
Primary
Posts : 113
Points : 339
Reputation : 3
Join date : 2018-03-05
View user profile

Re: পুরী ভ্রমণ কথা প্রথম পর্ব ( ভূমিকা )

on Wed Mar 07, 2018 3:24 pm
সপ্তম পর্বঃ
আজ খুব ব্যস্ত ও পরিশ্রমসাধ্য দিন | সকালে ফ্রেশ হয়ে চা-বিস্কুট খেয়েই রওনা ভূবনেশ্বরের দিকে সকাল আটটা নাগাদ | আজকের সারথী সুইফ্ট ডিজায়ার | ভ্রমন সূচী লিঙ্গরাজ মন্দির - উদয় গিরি- খন্ডগিরি – নন্দনকানন - ধৌলাগিরি (ধবলগিরি)- পিপলি | সারাদিনের চুক্তি ২৩০০ টাকা (পর্যটন মরসুম এবং ইংরাজী বছর শেষ বলে গাড়ীর সংখ্যাও যেমন কম, তেমনই ভাড়াও বেশী ) | রওনা হবার কিছুক্ষণের মধ্যে বিরতি প্রাতরাশের জন্যে "পতিত পাবন সুইট শপ" এ | ধোসা - ইডলি - মিষ্টি - চা | পান্তুয়ার মত গোল , গায়ে একটু ভাঁজ দেওয়া মিষ্টি স্বাদে শক্তি গড়ের ল্যাংচার মত | খুব সুস্বাদু | পরবর্তী অংশের বর্ণনা জায়গা অনুযায়ী পরপর দেওয়া যাক |

লিঙ্গরাজ মন্দির:
মন্দিরময় ভুবনেশ্বরে এটি একটি অন্যতম বৃহৎ মন্দির । কলিঙ্গ স্থাপত্যে একে পঞ্চরথের আদল বলা হয় । একাদশ শতাব্দীতে তে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন সোমবংশীয় রাজা জজাতি কেশরী । প্রবেশদ্বারটিও বেশ রাজকীয় । পিতলের কারুকার্যময় দরজা । ল্যাটেরাইট পাথরের খোদাই করা স্থাপত্য সত্যি সত্যি অভিনব । নিখুঁত হস্তশৈলী । স্বয়ংভূ বা মাটি থেকে আপনিই উঠে আসা রাজলিঙ্গকে হরি-হর জ্ঞানে পূজা করা হয় । একদিকে যা বৈষ্ণব এবং শৈব ধর্মের মেলবন্ধন ঘটায় । মন্দিরের চূড়ায় তাই ত্রিশূলের পরিবর্তে ধনুক | শিব এখানে পূজিত হন ত্রিভুবনেশ্বর বা স্বর্গ, মর্ত্য এবং পাতালের প্রভু রূপে । মূলমন্দিরে পুজো হল দুধ, বেলপাতা, তুলসীপাতা, ধুতুরা ফুল ও ধূপ-দীপ সহযোগে | ভুবনেশ্বরী দেবী হলেন এই শিবের প্রকৃতি । তাঁর মন্দির ও রয়েছে পাশে । মূল মন্দিরটি ৫৫মিটার উঁচু এবং ঐ বিশাল মন্দিরের চত্বরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আরো ১৫০টি ছোট বড় মন্দির ।

উদয় গিরি - খন্ড গিরি:
পূর্বঘাট পর্বতমালার দুটি ছোট অনুচ্চ পাহাড়ে একটি সড়কের দুপাশে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বৌদ্ধগুহা উদয়গিরি ও জৈনগুহা খন্ডগিরি। খন্ডগিরি ১২৩ ফুট ও উদয়গিরির ১১৩ ফুট উঁচু। উদয়গিরির প্রবেশপথের পাশে টিকিট কাউন্টার । উদয়গিরি প্রথমে বৌদ্ধ গুহা হিসাবে নির্মিত হলেও বৌদ্ধ-পরবর্তী যুগে খরবেলা রাজাদের সময় জৈনদের দখলে যায়। জৈনদের আমলে অতীতের গুম্ফা-গুলির সাথে আরো কিছু নুতন গুম্ফা যোগ হয়। প্রবেশপথের গোঁড়া থেকে সিঁড়ি দিয়ে অল্প উঠতেই স্বর্গপুরী গুম্ফা। দেয়ালে খোদিত এক সুন্দর হস্তিমূর্তি।
স্বর্গপুরীর উত্তর-পূর্বে বিশাল দ্বিতল রাণী গুম্ফা। এটি এখানকার বৃহত্তম ও সুন্দরতম ভাস্কর্য মন্ডিত গুম্ফা। গুম্ফার ভাস্কর্যে হাতি, বানর, অসিযুদ্ধ ও খরবেলার রাজার বিজয় মিছিল প্রতিফলিত।এখানে ছোট বড় মিলিয়ে মোট ১৮টি গুম্ফা আছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আর একটি গুম্ফা হল হস্তি গুম্ফা। এই গুম্ফায় ১৯০২ সালে পালি ভাষায় একটি শিলালিপি আবিস্কৃত হয়। উদয়গিরির গুম্ফা দর্শন শেষ করে খন্ডগিরি । এখানে মোট ১৫টি গুম্ফা আছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে প্রথমে ১নং ও ২নং গুম্ফা। ২নং গুম্ফা বেশ কারুকার্যমন্ডিত ও জীবজন্তু শোভিত। ২নং গুম্ফার মাথার উপর নাগরাজের ভাস্কর্যমন্ডিত দ্বিতল ৩নং গুম্ফা।

নন্দনকানন:
নন্দনকানন আসতে আসতেই গরমে হাল খারাপ | শীতের আশঙ্কায় আমাদের ব্যাগভর্তি গরম জামাকাপড় | কিন্তু পুরিতে এসে যা গরম পুরো নাজেহাল অবস্থা, শীতবস্ত্র ব্যাগেই জমা রয়েছে | যাই হোক নন্দনকাননের উল্টোদিকে একটি শীততপ নিয়ন্ত্রিত রেস্তোরাঁতে প্রথম ঢোকা হল, উদ্দেশ্য দ্বিপ্রাহরিক ক্ষুন্নিবৃত্তি সঙ্গে ঠান্ডায় একটু জিড়িয়ে নেওয়া | দুপুরের খাবারে আজ নিরামিষ, সঙ্গে স্যালাড-রায়তা, শরীর যন্ত্রটিকে কিঞ্চিত বিশ্রাম দেবার জন্যে | খাবার পর টিকিট কেটে ঢুকলাম নন্দনকানন | তিনশ টাকা দিয়ে একজন গাইডও নেওয়া হল, যতটা না গাইডেন্সের জন্য, তার চেয়ে বেশী ভীড় এড়িয়ে সহজে সাফারী ও অন্যান্য সুবিধা পাবার জন্যে | অাদপে হলও তাই | নিজেদের চেষ্টায় আজ কে আর সাফারী চড়া হতনা, এতই বড় লাইন ছিল | সাফারীতে চারটি অংশ - বাঘ, সিংহ, ভালুক ও হরিন | এই অংশগুলোতে জন্তু গুলি জঙ্গলে চড়ে বেড়াচ্ছে খাঁচার পরিবর্তে, আর দর্শনার্থীরা ঘেরা বাসে করে জঙ্গলের রাস্তা খুঁজে বেড়াচ্ছে জঙ্গলের আবাসিক দের | এই মুক্ত জঙ্গলের কনসেপ্টটা বেশ অভিনব ( কলকাতার চিড়িয়াখানার তুলনায় আর কি !) | আর সাফারী তে ঢোকা ও বেরোনোর গেটগুলো জুরাসিক পার্কের অনুকরণে বানানো | আমাদের ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন ছিলেন | বাঘ মামা রাস্তার ধারে বসে আমাদের দিকে তাকিয়েই যেন পোজ দিচ্ছে | খানিক বাদে সিংহ হেঁটে গেল বাসের পাশ দিয়ে | আর ভালুক তো আরো স্মার্ট, পা দিয়ে বাসের গায়ে ভর দিয়ে মুখ উঁচিয়ে বাসযাত্রীদের থেকে বিস্কুট নিয়ে খায় | হরিন আর ময়ূর প্রায় সর্বত্রই ঘুরে বেড়াচ্ছে | সাফারী শেষে অন্যান্য জন্তু যেমন জলহস্তী, ওরাংওটাং , শিম্পাঞ্জী, হরিন ইত্যাদি শেষে পৌঁছলাম পাখির এলাকায় | এখানেও একটি সুন্দর ন্যাচারাল জায়গা করে রাখা হয়েছে (পুরো জঙ্গলের উপরে উঁচু করে পাতটা জাল বিছানো) যাতে পাখীরা খোলা জায়গায় উড়ে বেড়াতে পারে | আর দর্শকরাও পাখি দের সাথে সহজে মজায় কাটাতে পারে ৷ এরপর মাছের অ্যাকোরিয়াম ও হাতী দেখেই আমরা নন্দন কাননের বাইরে | আরো প্রচুর কিছু দেখার আছে , কিন্তু এত স্বল্প সময়ে আমাদের দেখার মত ধৈর্য্য বা এনার্জী কিছুই অবশিষ্ট ছিল না ।

ধৌলা গিরি:
নন্দন কাননের পর দ্রষ্টব্য ছিল ধৌলা গিরি | কিন্তু সকলোই ক্লান্ত থাকায় ও সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় আমরা এটিকে সূচী থেকে বাদ দিলাম | কিন্তু এই জায়গাটি আমার আগে ঘোরা এবং এর বিশেষ ঐতিহাসিক তাৎপর্য থাকায়, পাঠকদের জন্য সামান্য বিবরণ যোগ করলাম |
ভুবনেশ্বর-পুরী রোডে ভুবনেশ্বর থেকে ৫ কিমি গিয়ে, ডাইনে ৩ কিমি দূরে দয়া নদীর ধারে অনুচ্চ ধৌলী পাহাড়। ভুবনেশ্বরই ছিল অতীত কলিঙ্গ রাজ্যের রাজধানী। খৃস্টপূর্ব ২৬১ সালে ধৌলী পাহাড়ের পাদদেশে দয়া নদীর পাড়ে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে মৌর্য সম্রাট অশোকের ঐতিহাসিক কলিঙ্গ-যুদ্ধ সংগঠিত হয় | কলিঙ্গ বিজয়ে সম্রাট আশোকের নির্দেশে এক লক্ষ কলিঙ্গ সৈন্য হত্যা এবং দেড় লক্ষ সৈন্যকে বন্দী করে নিয়ে আসা হয । সমসংখ্যক সাধারণ মানুষও মারা যায়। প্রায় এক মহাশ্মশানে পরিণত হয় কলিঙ্গ। দারুণ অনুশোচনায় দগ্ধ হন সম্রাট অশোক। বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নিয়ে চন্ডাশোক রূপান্তরিত হন ধর্মাশোকে । যুদ্ধ নয়, প্রেম ও ভালবাসা হয়ে ওঠে তাঁর ধর্ম-বিজয়ের পন্থা | ধর্মপ্রচারে তিনি প্রথমেই বেছে নেন ওড়িশ্যাকে। ধৌলী পাহাড়ের যে স্থানে দাঁড়িয়ে সম্রাট আশোক সৈন্যদেবর রক্তাক্ত মৃতদেহ ও তাদের তাজা রক্তে রাঙানো দয়া নদীর জল দেখে বিচলিত হয়েছিলেন, ঠিক সেই স্থানে স্মারক হিসাবে পাহাড়ের পাথর কেটে বানানো হয়েছে হাতির মুখ ও সামনের দুটি পা। হাতি এখানে বুদ্ধের ও শান্তির প্রতীক। এর অনতিদূরে এক প্রস্তর খন্ডে খোদিত আছে সম্রাট অশোকের প্রথম শিলালিপি অনুশাসন । কালো পাথরের গায়ে ব্রাহ্মী হরফে খোদাই করা রয়েছে ১১টি অনুশাসন । আর দুটি অনুশাসন অন্য জায়গায়।

পিপলি:
ফেরার পথে ছুঁয়ে যাওয়া হল একটি গ্রাম যা কিনা শিল্পীদের হাতের কাজের জন্য বিখ্যাত | গ্রামের প্রায় প্রতি পরিবার, নারী পুরুষ নির্বিশেষে এই কাজে নিযুক্ত | শিল্পকলার উপর নির্ভর করে একটি গ্রামের জীবিকা ও অর্থনীতি কিভাবে দাড়িয়ে থাকতে পারে তার উজ্জ্বল নিদর্শন পিপলি | মূলত রঙ বেরঙের কাপড়ের উপর সূতোর কাজ ( এপ্লিক), তালপাতার উপর হাতেআঁকা, ডোকরার কাজ, পিতলের কাজ ইত্যাদি বিখ্যাত | ব্যাগ, বিছানার চাদর, দোলনা, ছাতা, ঠাকুর-দেবতার ফোটো, ঘর সাজানোর অন্যান্য জিনিস এবং আরো কত কি |
আজকের মত ঘোরা শেষ | হোটেলে ফেরার পালা | আবার সমুদ্রের দুর্নিবার হাতছানি |
avatar
Primary
Primary
Posts : 113
Points : 339
Reputation : 3
Join date : 2018-03-05
View user profile

Re: পুরী ভ্রমণ কথা প্রথম পর্ব ( ভূমিকা )

on Wed Mar 07, 2018 3:25 pm
অষ্টম তথা শেষ পর্ব :
এবারের শীতকালীন ভ্রমন আজ কে শেষ | ফলে যতটা সম্ভব সাপটে উপভোগ করা যায় | অন্য কোনদিনই সূর্যাস্ত - সূর্যোদয় দেখার এর চেষ্টা করিনি কুয়াশার কারণে | আজ সকাল সকাল উঠে পরিকল্পনা মাফিক একা একাই রওনা দিলাম মাছ ধরা দেখতে | সমুদ্রের পাড় দিয়ে খানিক এগোতেই চোখে পড়ল দূরে কিছু নৌকো ও মানুষের জটলা | কাছে উঠতেই দেখি নৌকো তে সাজানো সদ্য তুলে আনা কিছু মাছ , কাঁকড়া ; কোথাও জাল থেকে ছাড়ানো চলছে | কিছু পর্যটক হামলে পরে দরদাম করছেন ( যদি অন্য কেউ আগে নিয়ে ফেলে সেই ভয়ে) | কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে সমুদ্রের পাড়ে ইদানিং মাছ ওঠে কম, ঢেউ এ ভেসে আসা শামুক , ঝিনুক প্রায় নেই বললেই চলে | আমার শৈশবে সমুদ্র সৈকতে ঝিনুক কুড়ানোর মধ্যেই এক অপার্থিব মাদকতা ছিল | যাই হোক আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার পরিবারের বাকী সকলেই সমুদ্র সৈকতে | ঢেউয়ের ভাঙাগড়া দেখতে দেখতেই চা-বিস্কুট-ডিম পাউরুটি | মিহি শীতের মিঠে রোদ গায়ে মেখে সমুদ্রের সবটুকু স্বাদের আস্বাদন | রোদ চড়তেই গন্তব্য নরসিংহ সুইটস - উদ্দেশ্য আত্মীয়, বন্ধুদের জন্যে খাজা সংগ্রহ | অতিরিক্ত হিসেবে ছানাপোড়া ( অনেকটা যেন ছানার তৈরী কেক) | ফেরার পথে পুরীর গামছা ও লাঠি কেনা স্মৃতির উদ্দেশ্যে । বেলা গড়াতেই সমুদ্রস্নান তথা জলকেলি | ইদানিং পুরীর সমুদ্রতট বেশ ঢালু, ফলে খুব বেশীদূর পর্যন্ত ( সমুদ্রের গভীরে) গিয়ে স্নানের উপযোগী নয় | গুপ্ত বৃন্দাবন যাবার ইচ্ছা থাকলেও সময় অভাবে আর হল না | দুপুরে হালকা খাওয়া-দাওয়া ও হাল্কা ঘুম | দুপুর গড়াতে না গড়াতেই গগন বিদারী আওয়াজে ঘুমের দফারফা | দরজা খুলতেই বোঝা গেল হোটেলের বাগানে মিউজিক সিস্টেম লাগিয়ে পরীক্ষা নিরিক্ষা চলছে ৩১ শে ডিসেম্বরের রাতকে আরো মোহময়ী করে তুলতে | মদিরা, ডিজে এবং নাচ (কখনো সখনো নারী ) ছাড়া ইদানিং কোন অনুষ্ঠানই ঠিক জমে ওঠে না, তা সে পাড়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই হোক বা পূজোর ভাসান, পিকনিক কিংবা বছরভর বিভিন্ন অনুষ্ঠান-পার্বন | ভগবানের অসীম কৃপা এই ভয়াবহ দূর্যোগের প্রভাবে পড়তে হয় নি, কেননা আজকেই আমাদের ফেরা |

দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়ে ঘটনাপ্রবাহের বাইরে, শহুরে কোলাহল থেকে দূরে এই কয়দিনের পারিবারিক ছুটি এক ঝলক টাটকা বাতাসের মত | শুধুই রোজকার কর্মব্যস্ত জীবন থেকে দূরে বলে নয়, পরিবারের সকলের সাথে কদিনের ঐকান্তিক সান্নিধ্য ও এ ভ্রমণের অনেকখানি পাওয়া | আবার গতানুগতিক জীবনপ্রবাহে ঢুকে পড়ার ডাক এবং প্রতীক্ষা পরবর্তী ছুটির বেড়ানোর |

এবারের ভ্রমন কথা এখানেই শেষ | যারা সঙ্গে ছিলেন এ-কদিন, তাঁদের সকলকে ধন্যবাদ । আশা করি চেনার মধ্যে কিঞ্চিৎ অচেনার স্বাদ দিতে পেরেছি |

সঙ্গে থাকুন | আরো কিছু গল্প নিশ্চয়ই লিখব খুব শীগগীর |
Sponsored content

Re: পুরী ভ্রমণ কথা প্রথম পর্ব ( ভূমিকা )

Back to top
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum