প্রথম দিনেই পুরীর প্রেমে  
 
      বন্ধু মহলে এমনিতেই আমার বদনাম আছে। আমি নাকি গিন্নি ছাড়াই সব জায়গায় ঘুরতে যাই। তাই মনে মনে প্লান কষছিলাম কিভাবে এর থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। শেষে সুযোগটা বুঝি এসেই গেল।

     সেই তো সেদিন চায়ের দোকানে বসে আড্ডা হচ্ছিল। সময়টা ছিল সন্ধ্যা। আলো আধাঁরি আলোয় দোকানের বেঞ্চে বসেই কথাটা হল। বিশ্বজিৎকে বললাম "অনেক তো হল একটা ট্যুর তো করা যেতেই পারে, কি বলো ?" খুবই কাছের বন্ধু বিশ্বজিতের উত্তর "হুম, তা তো হতেই পারে। তবে দাড়াও আগে বাড়ির সাথে কথা বলি।" সন্ধ্যাটা খুটি নাটি একথা সেকথাতেই কেটে গেল।তবে আশায় ছিলাম ফাইনাল কিছু একটা নিশ্চয়ই হবে।

      ফোনটা এল দুদিন পর রাত নটা নাগাত। "সব ঠিক আছে। গিন্নী রাজি। আর হ্যাঁ, সঙ্গে আরও এক জন যোগ দিয়েছে। চন্দন ও তার পরিবার।" মানে  চন্দনের গিন্নী আর ছোট্ট বাচ্চা। সবারই এক। ভালই হল। কেননা চন্দন আমার কলেজ জীবনের বন্ধু। মাঝের সময়টা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এই যা। আর বিশ্বজিৎ তো আরও কাছের বন্ধু। তাই ওর প্রসঙ্গে আলাদা করে কিছু বলবার নেই। শেষে বললাম "শর্মিষ্ঠা আর তুমি মিলে রুম আর ট্রেনের টিকিট করে ফেল।"

     এভাবেই আমাদের কথা এগোচ্ছিল। শেষে যাবার তারিখ ও ঠিক হল, জানুয়ারির শেষে। প্লানটা যেহেতু মাস খানেকের আগের। তাই একটা ঠান্ডা স্রোত মনের মধ্যে বইছিল। কি করবো ? কি খাব ? কোথায় যাব ? এই নিয়েই প্রায়ই আলোচনা হত আমার গিন্নির সাথে। ছুটি তো নিতে হবে। তাই আগে থেকেই এর জন্য অফিস থেকে ছুটিটাও নিয়ে নিলাম।

     কিন্তু যাবার আগের দিন অবধি ডিউটি! সময় আর পেলাম না ব্যাগ গুছানোর। কিন্তু কি অবাক করা কান্ড গিন্নী আমার চার্জার, চশমা, টুপি জামা,জুতো সব গুছিয়ে রেডি করে রেখেছে। কোন মাথা ঘামাতেই হল না। বিকেল বিকেল রেডি হয়ে বিশ্বজিৎকে ফোন করে বললাম বড় রাস্তায় আসতে। সেখান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে আমরা সোজা হাওড়া।

     ওদিকে চন্দনও গড়িয়া থেকে স্ত্রী বাচ্চাকে নিয়ে হাওড়ার দিকে রওনা দেয়। সময়ের কিছু আগেই আমরা সকলেই হাওড়া পৌছে যাই। নিদিষ্ট বগিতে উঠে আমরা ব্যাগপত্র ঠিকঠাক রেখে কিছু জলের বোতল, চিপস্, অন্যান্য খাবার প্লাটফর্ম থেকে নিয়ে নিই। মোট তিনটি পরিবার প্রত্যেকের একটি করে বাচ্চা সঙ্গে বিশ্বজিতের এক ছোট বোন। তাই গিন্নিদের মধ্যে কখন আলাপচারিতা শুরু হবে সেই আশায় ছিলাম। ফিরে এসে দেখি রীতি মতো তারা আসর জমিয়েছে। আমরাও আর দেরি করি কিসে। আমরাও আমাদের পুরনো সম্পর্ক গুলো ঝালিয়ে নিলাম।

     রাতে খাওয়ার জন্য যে যার মতো করে ঘরোয়া খাবার করে এনেছিলাম। তাই আমরা নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে খেলাম। সঙ্গে  গল্প চলছিলই। ঘুম আসছিল না। একটা সময় সকলেই ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙলো সাড়ে তিনটির কিছু পরে। বিশ্বজিৎকেও তুলে দিলাম। ঠান্ডাটাও বেশ কম। ব্যাগপত্র সব গুছিয়ে ছোটদেরও রেডি করে নিলাম। পৌনে পাঁচটায় আমরা পৌঁছে গেলাম পুরী। গোটা ট্রেন শুদ্ধ মানুষ পিল পিল করে স্টেশনে নামল। তাদের ভাষা শুনে বুঝলাম তারা প্রায়ই বাঙালি। বেশ ভালো লাগছিলো। কেননা পুরী আমার প্রথম বার।

     সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আমরা স্টেশনের বাইরে এলাম। দাম দরাদরি করে একটা গাড়ি ও ঠিক করলাম। লাগেজগুলো পটাপট গাড়ির পিছন দিকে তুলে আমরা গাড়ির সামনে উঠে পড়লাম। ওদিকে ঘুমিয়ে কাদা পুঁচকে গুলোও উঠে পরেছে। কেউ বা কান্না জুড়েছে কেউ বা বায়না জুড়েছে। নিজেদের মধ্যে সবে গল্প শুরু করেছি, এরই মধ্যে আমরা নেতাজী চকে পৌছে যাই। এত কাছে তা আমরা ভাবতেই পারিনি। যাই হোক আমরা পৌছে আমাদের নিদিষ্ট রুমে যাই। ভীষণ সুন্দর রুম। যা ভাবা,তার থেকে অনেক বেশি সুন্দর ছিলো। নিজস্ব বসবার ঘর, ডাইনিং রুম, কীচেন। একটা গোটা ফ্লোর আমাদের জন্য বরাদ্দ ছিল। মনটা তো ভরে গেল।

    ব্যাগপত্র রেখেই দুটো চায়ের অর্ডার দেওয়া হল। চায়ের ফাকে ফ্রেশ হয়েই আমরা তিন বন্ধু বেড়িয়ে পড়লাম বীচের দিকে। উদ্দেশ্য বাইরেটা একটু ঘুরে দেখা  আর কিছু মেডিসিন, বাচ্চাদের জন্য কিছু খাবার কেনা। এমনিতেই বেশ সকাল নেতাজী চক থেকে একটু এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল সমুদ্র সৈকত। একে বারে নির্জন। মনে পরে যাচ্ছিল দীঘার কথা। আমরা তিনজন বালির উপর দিয়েই হাটা লাগালাম উদ্দেশ্যহীন ভাবে। দূরে দেখলাম বেশ ভীড়। তখনও জানিনা ওটা স্বর্গদ্বারের দিক। বাঁ দিকে  সমুদ্র ডানদিকে বালির রাশি ও কিছু হোটেল। আর সামনের দিকে জালে আটকে পরা মাছ দেখতে উৎসাহী কিছু মানুষের কোলাহল। সামনে যেতেই দেখলাম সামুদ্রিক কাঁকড়া আর কিছু নাম না জানা মাছ। কিছু মানুষ তো এমন ভাবে ছবি তুলছিল, মনে হচ্ছিল হোটেলে গিয়ে তাই ভেজে খাবে।

    আমরা এক ডাবওয়ালাকে জিজ্ঞেস করে পৌছে গেলাম মেডিসিন স্টোরে। কিছু মেডিসিন ও বাচ্চাদের খাবার নিয়ে ফিরলাম বাই রোড ধরে।  পথে এটিএম দিয়ে টাকা তোলা হল খরচের জন্য। সূর্যটা ততক্ষণে নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়েছে। যেতে যেতেই আমরা বাড়িতে ফোন করে জানাই যে আমরা ঠিক মতোই পৌছে গেছি।

     গেস্ট হাউসে ফিরেই দেখি সবাই মিলে ড্রয়িংরুমে হাট বসিয়েছে। কেউ টিভি, কেউ বা গল্প করতে ব্যস্ত। আর বাচ্চারা তো ব্যস্ত খেলতে। আর ওদিকে ব্রেকফাস্টও রেডি। পরোটা আর আলু সব্জি।
     
     খেয়ে দেয়েই আমরা বেরোলাম সমুদ্র স্নানে। সঙ্গে নিলাম গামছা, মোবাইল, সেলফি স্টিক, ব্যাগ, ছোটদের জামাকাপড়, জলের বোতল ইত্যাদি। দলবল মিলে গিয়ে পরলাম বেশ ফাঁকা সমুদ্র সৈকতে। পুরীতে এসে সমুদ্র স্নান, আর কোন ছবি হবে না তা কখনও হয়! চন্দন আর বিশ্বজিৎ গিন্নিদের সঙ্গে নিয়ে বেশ কিছু ছবি তুলল। আমিও কম যাই কিসে ? পুঁচকেটাকে সঙ্গে নিয়ে আমিও বেশ কিছু ছবি তুললাম। ছোটগুলি বেশ খুশি। হাল্কা জলে তারাও হেটে বেড়াচ্ছে তাদের মায়েদের সাথে। সেকি আনন্দ! ছোটদের আনন্দে আমরাও আরোও বেশী করে খুশি হচ্ছিলাম। আমরা প্রত্যেকেই গা ভাসিয়ে দিলাম জলের স্রোতে। উন্মত্ত ঢেউ,সুনিবিড় শান্ত পরিবেশ, দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ পুরোনো স্মৃতি উস্কে দিচ্ছিল। সবে যেন পুরীর প্রেমে পরলাম।

     ফিরে আর একবার স্নান করতে বাধ্য হলাম নোনা জল আর বালির জন্য। ততক্ষণে শর্মিষ্ঠা মেয়েকে খাওয়াতে বসেছে। আর আমি বসলাম টিভির সামনে। আর গিন্নির গেছে ছোটটার খাবার গরম করতে। ছোটদের খাবার শেষে আমরা বসলাম দুপুরের খাবারে। স্যালাড, ডাল, ফুলকপির তরকারি আর কি চাই। পেটপুরে খেলাম। খিদে এমনিতেই বেশ পেয়েছিল। কথা হল বেলা তিনটেতে মন্দিরের উদ্দেশ্য বের হব। কিন্তু সবাই এত ক্লান্ত ছিল যে সবাই ঘুমিয়ে পরল। শেষে বিশ্বজিতের ডাকে উঠে আমরা তৈরী হয়ে নিলাম।

     ব্যাগপত্র, মোবাইল রেখে ঢুকে পরলাম মন্দির চত্বরে পূজো দেওয়ার উদ্দেশ্য। ডালা দেব ভাবছি এমন সময় এক পান্ডার আবির্ভাব। তার কথা অনুযায়ী এক ডালায় তিন দেবতার একসাথে পুজো হবে না। নিতে হবে এক সাথে তিনটি ডালা। কিন্তু আমরা ভক্তি তে জগন্নাথের উপর বিশ্বাস রেখে একটি ডালা নিতেই সম্মত হলাম। লাইন দিলাম। প্রনাম করলাম। জগন্নাথ দর্শন করলাম। ঘুরে ঘুরে মন্দিরের কারুকার্য দর্শন করলাম। তবে সব থেকে বেশী দেখলাম আগত মানুষজনকে। কত ধরনের মানুষ। দেখে মনে হল ইশ্বর ভক্তির তুলনায় এখানে টাকাটাই প্রাধান্য পাচ্ছে। পাছে গিন্নি আমার ভক্তির উপর সংশয় প্রকাশ করে তার আগেই চন্দন আর বিশ্বজিতের পরামর্শক্রমে মন্দিরত্যাগ করলাম।

    সময় তখন প্রায় পাঁচটা। ইচ্ছে ছিল জগন্নাথের মামা বাড়ি, মাসি বাড়ি যাওয়ার। সময়ের জন্য তা আর হয়ে উঠল না। শেষে পথের ধারে ক্ষীর কদমে মন ভুলিয়ে বীচের দিকে রওনা দিলাম।
অটোওয়ালাকে পয়সা মিটিয়ে আমরা গিয়ে পরলাম সমুদ্রের পারে। অজস্র দোকান আর মানুষের কোলাহলে মিশে গেলাম আমরা। হাল্কা করে পেট পুজো করে অটোতে নেতাজী চক্ হয়ে আমরা ফিরলাম আমাদের রুমে।

     রাতের খাবার তৈরিই ছিল। খেয়ে দেয়ে বাচ্চাদের ঘুম পারিয়ে আমরা বসলাম হাল্কা আড্ডায়। হাল্কা ঠান্ডায় আমাদের আড্ডা চলল অনেক রাত অবধি। ব্যালকনিতে দাড়িয়ে বাইরেটা কোন অংশে কোলকাতা থেকে আলাদা লাগছিল না। পিল পিল করা বাঙালি, বাঙালি খাবার, বাংলা ভাষা আর সমুদ্র সৈকত মুগ্ধ করছিল আমায়। কি জানি! হয়ত প্রথম দিনেই পুরীর প্রেমে পরে গেছি।
 
বাকিটুকু আগামী পর্বে।
আর হ্যাঁ, আপনার মতামত ও অভিজ্ঞতা জানাতে ভুলবেন না। আশায় রইলাম ।