Churn : Universal Friendship Log in

PEACE , LOVE and UNITY


Share

descriptionSandakfu Superhit সান্দাকফু সুপারহিট  EmptySandakfu Superhit সান্দাকফু সুপারহিট

more_horiz

সান্দাকফু সুপারহিট Sandakfu Superhit

Sandakfu Superhit সান্দাকফু সুপারহিট  12193715_10206590588815930_8807747989545378450_n
Sandakfu Superhit সান্দাকফু সুপারহিট  11260505_10206590588535923_2903119992766034228_n
Sandakfu Superhit সান্দাকফু সুপারহিট  12065697_10206590588655926_297253109121554995_n

আমাদের পাড়ার নন্দীখুড়োর যখন শ্বাস উঠেছিল, তখন খুড়োর আশেপাশে কপালে তিলক কাটা পুণ্যসচেতন শুভানুধ্যায়ীরা আবদার জানিয়েছিল, “হরি বলো খুড়ো, হরি বলো”। মরণকালেও খুড়োর জ্ঞান ছিল টনটনে। রসবোধ বজায় ছিল চমৎকার। রীতিমতো চোখ পাকিয়ে খুড়ো ধমকে উঠেছিল, – ‘না বাপু অত কথা আমি এখন বলতে পারব না। হাঁপিয়ে এত সুখ তাতো আগে জানতুম না । প্রাণ ভরে একটু হাঁপাতে দে দেখি।

আমাদের হয়েছে সেই দশা। আমরা মানে আমি, শীর্ষেন্দু, জিকো আর বিনায়ক। চারজন মিলে মানেভঞ্জন থেকে টুলিংএর দিকে হাঁটা শুরু করেছি। লক্ষ্য সান্দাকফু। পশ্চিমবঙ্গের উচ্চতম শৃঙ্গ। হাঁটছি ঘণ্টাখানেক প্রায়। এর মধ্যে জিভ বেরিয়ে থুতনি ছুঁয়ে ফেলেছে। হাঁটার ফাঁকে যখন পারছি, একটু হাঁপিয়ে নিচ্ছি আর মনে মনে ভাবছি খুড়োর কথাই সত্যি। হাঁপিয়ে যে কী সুখ তা আগে তো বুঝিনি। শীর্ষেন্দুর বাঙালিসুলভ নেয়াপাতি ভুঁড়ির দিকে তাকিয়ে শুরুতেই আমাদের গাইড মোহন সন্দিহান গলায় প্রশ্ন তুলেছিল –‘সান্দাকফু ইঁহা সে একত্তিশ কিলোমিটার হ্যায়। চল পায়েঙ্গে আপলোগ ?’ আমরা সমস্বরে হ্যাঁ বলা সত্ত্বেও তাঁর সাবধানবানী- ‘আপলোগ চাহে তো ইঁহা সে গাড়ি ভি লে সকতে হ্যায়’। তখন সে প্রস্তাব ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছি ঠিকই, এখন মনে হচ্ছে হ্যাঁ বললেই ভালো হত বোধহয়।

অতএব বাধ্য হয়েই হাঁটা চালাচ্ছি। আর মনে মনে গালিগালাজ করছি সৌম্যকে। সৌম্য আমাদের এলাকার পাহাড় বিশেষজ্ঞ। বিস্তর দিঘা-পুরী-দার্জিলিং ঘুরে ফেলার পর একটু ‘সাহসী’ ট্রিপের জন্য শরণাপন্ন হয়েছিলাম ওর। সান্দাকফু ট্রেকিং এর আইডিয়াটা ওরই। বিজ্ঞের মত বলেছিল – ‘পারিস তো সান্দাকফু ট্রেকটা এইবেলা সেরে ফেল। পুজোর পরপর এই সময়টা ওয়েদারটা থাকে খাসা। বৃষ্টি-ফৃষ্টির ঝঞ্ঝাট নেই। গ্যারান্টি দিচ্ছি অসাধারণ ভিউ পাবি’। মানেভঞ্জন পর্যন্ত গাড়ির হদিস আমি নিজেই জানতাম। তার পরের গাড়ির খোঁজ নিতে যেতেই রীতিমত খেঁকিয়ে উঠল সৌম্য। ‘ছ্যা, ছ্যা, ওই রাস্তায় কেউ গাড়ি করে যায় ? হেঁটে না গেলে কিস্যু ফিল করতে পারবি না’। ওর ওই হাঁটার উপদেশ পালন করতে গিয়েই এখন হ্যা হ্যা করে জিভ বের করে হাঁপাতে হচ্ছে আমাদের।

নিউ জলপাইগুড়ি থেকে গাড়ি বদলে বদলে মানেভঞ্জন পৌঁছে গাইড ঠিক করতে সময় লেগেছে মিনিট পনেরো মাত্র। তার পরের মিনিট দশেকে ছোটখাটো ক্লাস নেওয়ার ভঙ্গিতে গাইড মোহন বুঝিয়ে দিল আমাদের সম্ভাব্য রুটম্যাপ ও ট্রেকিং প্ল্যান কেমন হতে চলেছে। হেডমাস্টার সুলভ গাম্ভীর্য নিয়ে ও বুঝিয়ে দিল, চড়াই ওঠার সময় নিজেদের মধ্যে কথা যতটা সম্ভব কম বলতে হবে। ক্যালোরি জোগানের জন্য ভারী খাবারের বদলে মাঝে মাঝে কামড় দিতে হবে ক্যাডবেরি আর কলায়। তাতেই মিলবে ‘ইনস্ট্যান্ট এনার্জি’। যতক্ষণ তেষ্টায় ছাতি না ফাটছে ততক্ষণ জল না খাওয়াই ভালো। তাতে নাকি পেট ভারী হয়ে যায়। জলের পরিবর্ত সেখানে চিউইং গাম। ১২ বছরের অভিজ্ঞতায় মোহন নাকি বহু বাঙালিবাবুকে দেখেছে কোঁৎকোঁৎ করে একপেট জল খেয়ে নাদা ফুলিয়ে পথের পাশে থেবড়ে পরে থাকতে। আর ধূমপান তো নৈব নৈব চ।

সকাল সাড়ে ন’টায় মানেভঞ্জন থেকে হাঁটা শুরু করে দুপুর দেড়টার মধ্যে পৌছতে হবে মেঘমায়। এই আড়াই কিলোমিটার পেরোতে দম বেরিয়ে গেল আমাদের। ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’ ব্যাপারটাকে যদি সত্যি বলে ধরে নিই, তাহলে বাকি রাস্তায় আর কত যে ভোগান্তি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল তার কথা ভেবে কান্না পাচ্ছিল। মোহন কিন্তু অবিচল। পিঠে দামড়া সাইজের একটা ব্যাগ নিয়ে তরতরিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কখনও বা শিস দিয়ে গান গাইছে। কখনও আবার দূরে পাহাড়ের দিকে আঙুল দেখিয়ে সোৎসাহে জানাচ্ছে তার বিশেষত্ব। সত্যি বলতে বাধা নেই, কিছুটা হলেও মনটা খুঁতখুঁত করছিল। কেমন যেন ঘিঞ্জি লাগছিল গায়ে গায়ে ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা চূড়াগুলোর দিকে তাকিয়ে। কই সৌম্য যেমনটা বলেছিল, চোখ জুড়িয়ে যাবে, দৃষ্টি ফেরাতে পারব না, সেই অনুভূতিটা তো হচ্ছে না। মনে হল চারপাশে একগাদা হাইরাইজের মাঝখান দিয়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে যাচ্ছি।

ছবিটা বদলাতে শুরু করল মেঘমা পেরোনোর পর। ততক্ষণে আশেপাশের পাহাড়গুলোর মধ্যে দূরত্ব বাড়তে শুরু করেছে। তার ফাঁক দিয়ে আরও চওড়া হয়ে উঠছে আকাশ। তারই খাঁজে খাঁজে মেঘ নাক গলিয়ে সূর্যের তাপ কমাচ্ছে ক্রমশ। পাহাড় হয়ে উঠছে আরও আরও সবুজ। চারিদিক নজর বোলাতে বোলাতে বুঝতে পারছি নাহ, সৌম্য বাড়িয়ে বলেনি একবর্ণও । আগেরদিন রাতে সরাইঘাট এক্সপ্রেসের টিকিট কনফার্ম হয়নি। অগত্যা জেনারেল কম্পার্টমেন্টে হাঁটুতে হাঁটু ঠেকিয়ে খাড়া পিঠে জেগে বসে আসতে হয়েছে। তারপরে হাঁটা শুরু হতে না হতেই মোহনের একগাদা ‘ডুস অ্যান্ড ডোন্টস’ সম্বলিত হিটলারি শাসন। সব মিলিয়ে কিছুটা হলেও ক্লান্তি ডানা বাঁধছিল মগজে, টুলিং এ এসে দ্বিতীয় দফার বিশ্রামের জন্য থামতেই রীতিমতো ঝরঝরে লাগতে শুরু করল। ততক্ষণে পেটে ছুঁচোয় ডন মারতে শুরু করে দিয়েছে। টুলিংএর তেমাথার মোড়টায় এসে দাঁড়াতেই পিঠের দিক থেকে ভেসে এল এবড়ো খেবড়ো বাংলায় কিছু সাদর সম্ভাষণ -‘ভাল খাবেন, তো এখানে আসবেন’। চমকে মুখ ফিরিয়ে আবিষ্কার করলাম বছর পঁচিশের এক যুবতীকে। চেহারায় চৈনিক প্রভাব স্পষ্ট। ইনি যে স্থানীয় বাসিন্দা তা আর আলাদা করে বলে দিতে হয় না। উচ্চারণে বাঙালিয়ানা এতটাই আন্তরিক যে তাঁর হোটেলে(ঘুপচি ঘরে একটা মাত্র টেবিল। তাকে ঘিরে খান চারেক চেয়ার। একে হোটেল বলা যায় কি?) স্যুপি নুডলস খাবার প্রলোভন এড়ানো গেলনা। বিনি তামাং প্রবল আলাপী। শোনেন কম, বলেন বেশি। মিনিট পাঁচেকের আলাপেই বলে দিলেন বাংলা শিখেছেন আমাদের মত টুরিস্টদের সঙ্গে মিশতে মিশতেই। কলকাতায় বার পাঁচেক এসেছেন। ময়দানের আমলের বইমেলা দেখেছেন, ধর্মতলায় ফুচকা খেয়েছেন, কালীঘাটের মন্দির দেখেছেন এবং গড়িয়াহাটের ফুটপাতের দোকানীদের দরদামে হারিয়ে প্লাস্টিকের বাটির সেট কিনেছেন। এরপর কি বিনিকে অবাঙালিদের পর্যায়ে ফেলা যায়?

গল্প হয়ত চলত আরও বেশ কিছুক্ষণ। কিন্তু রসভঙ্গ করল মোহন। দাঁত খিঁচিয়ে জানালো, এখানে আর দেরি করলে সূর্য ডোবার আগে নাকি কিছুতেই গৈরিবাসে পৌঁছান যাবে না। মোহনের ছকে দেওয়া প্ল্যান অনুযায়ী ওখানেই সেদিন রাত কাটানোর কথা। অর্থাৎ বিনিকে বিদায় জানিয়ে ফের শুরু করলাম হাঁটা। গৈরিবাস পর্যন্ত রাস্তা হাঁটার পক্ষে চলনসই হলেও, ওই রাস্তায় গাড়ি কিভাবে যে চলাচল করে তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত। ভাঙাচোরা গড়নের ল্যান্ডরোভারগুলোর ‘পড়ে গেলাম পড়ে গেলাম’ ভাব নিয়ে ল্যাগব্যাগ করতে করতে যেভাবে খাড়াই পথ উঠে যায় তার সঙ্গে তুলনা চলে একমাত্র বসা অবস্থা থেকে উটের উঠে দাঁড়ানোর। হাসিও পায় আবার ভেতরে বসে থাকা লোকগুলোর কথা ভেবে ভয়ও করে। মোহন আবার ওই রাস্তায় বেশ পরিচিত মুখ। আমাদের খাদের সঙ্গে প্রায় সেঁটে দিয়ে যে কটা গাড়ি পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল, তার প্রায় সবকটার ড্রাইভারই মোহনের সঙ্গে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করে গেলেন। আমরা অবাক হচ্ছি বুঝতে পেরে মুখে খৈনি পুরে মোহনের উত্তর, ১২ বছর ধরে এই রাস্তায় যাতায়াত করতে করতে প্রায় সকলের সঙ্গেই আলাপ জমে গিয়েছে ওর। আন্দাজ চারটে নাগাদ সিঙ্গালীলা ন্যাশনাল পার্ক চেকপোস্টে মাথাপিছু ১০০ টাকা দিয়ে পাস কেনার পরই মোহন ফরমান জারি করল ‘জলদি পাও চালাইয়ে ভাইয়া। অউর থোড়া তেজ। বরনা অন্দেরা হো জায়েগা’।

মোহনের সময়জ্ঞান যে কতটা টনটনে সে কথা বুঝতে পারলাম একটু পরেই। প্রাণপণ পা চালিয়ে আরও তিন কিলোমিটার হেঁটে গৈরিবাসে যখন পৌঁছলাম, তখন পাহাড়ের কোল বেয়ে সদ্যোজাত সন্ধ্যে নেমেছে। ছোট্ট একটা বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দিল মোহন। গৃহকর্ত্রী জানিয়ে দিলে সাড়ে সাতটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে রাতের খাবার দিয়ে দেবেন তিনি। সাড়ে সাতটায় ডিনার ! শুনে মুখ চাওয়া-চাইয়ি করছি। শেষ কবে এতো তাড়াতাড়ি ভাতের থালার সামনে বসেছি মনে পড়েনা। তবে যস্মিন দেশে যদাচার। পাহাড়ে আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজটাই দস্তুর। একই অবস্থা আমাদের সাথে একই বাড়িতে মাথা গুঁজতে আসা চার বিদেশিনীরও। গিতার-ফিটার কাঁধে ঝুলিয়ে সুদূর নেদারল্যান্ড থেকে এসেছে এলি এবং তার তিন বান্ধবী। ফুকফুক করে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে এলি জানালো এই পাহাড়ি ঠাণ্ডা তার কাছে নতুন কিছু নয়, তবে বিজলি বাতির অনুপস্থিতি তাকে বড্ড ভোগাচ্ছে। চার্জের অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া মোবাইল ফোন এবং ট্যাবলয়েড পিসিটা নাড়াচাড়া করতে করতে এলির স্বীকারোক্তি, ‘আই ক্যান স্যাক্রিফাইস অল অফ মাই সোশ্যাল কন্টাক্টস ফর দ্য বিউটি অফ সান্দাকফু। ইটস, প্রাইসলেস।” মোমবাতির আলোতে ডিনার সারলাম এলিদের সাথে বসেই। মেন্যুতে সবজির টুকরো খচিত গরমা গরম খিচুড়ি। সঙ্গতে কোয়াসের তরকারি আর অমলেট। বাড়তি পাওনা বাঁশের চরম ঝাল আচার। সারাদিনের প্রবল পরিশ্রম আর ঘুমাতে যাওয়ার আগে মোহনের সকাল ছ’টার মধ্যে বিছানা ছাড়ার হুঁশিয়ারি, দুইয়ে মিলিয়ে ঘুম এল ঝড়ের গতিতে।

ছটা তো দূর কি বাত। দারুণ ঠাণ্ডায় পরদিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল তখন ঘড়িতে বাজে ৫টা। ভারী লেপে নিজেকে মুড়ে কোনমতে উঠে বসে দেখি একই অবস্থা শীর্ষেন্দুরও। বন্ধু মহলে কুম্ভকর্ণ হিসেবে ওর খ্যাতি আছে। কানাঘুষো শোনা যায় যে ও নাকি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমোতে পারে। ঠোঁট উল্টে শীর্ষেন্দু জানালো যে, শেষ রাতের দিকে নাকি একবার টয়লেটে গেছিল ও। পায়ের পাতায় জল লেগে এমন ঠাণ্ডা লেগেছে যে, বাকি রাতটুকু দু চোখের পাতা এক করতে পারেনি। কথাটা নেহাত মিথ্যে নয়। লেপ ছেড়ে উঠে ব্রাশ করবার জন্য জলে হাত লাগতেই মালুম হল পাহাড়ি ঠাণ্ডা কাকে বলে।

কোনওমতে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ব্রেকফাস্ট সারলাম যখন ততক্ষণে রোদ ফুটেছে ঠিকই, কিন্তু শীতের সঙ্গে লড়তে পায়ে উঠেছে মোজাসহ স্নিকার, জিনস, আর তিন পরতে সোয়েটার, পুলোভার আর জ্যাকেট। গলায় মুড়েছি মাফলার। সঙ্গে কানঢাকা টুপি। তাও ঠান্ডা বাগ মানছে না। মোহন আশ্বাস দিল, হাঁটতে শুরু করলে নাকি একটু হলেও শীত কমবে। অতএব পিঠে ব্যাগ তুলে নিয়ে ফের হাঁটা শুরু। গন্তব্য চৈরিচক। পথে ঘণ্টাখানেকের জন্য বিশ্রাম সুকিয়াপোকরিতে।

গৈরিবাস থেকে সুকিয়াপোকরির রাস্তার কথা না বলাই ভাল। আবার না বললে সেটাও হবে চরম অবিচার। যেমন ভয়ঙ্কর, তেমনই সুন্দর। সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্কের আসল ট্রেলার শুরু হয় এই রাস্তা থেকেই। খাড়াই উঠে গিয়েছে সোজা সান্দাকফু পর্যন্ত। তার মাঝে হয় সুকিয়াপোকরি না হলে চৈরিচকে রাত কাটানোর বন্দোবস্ত করে দেবে মোহন। গৈরিবাস থেকে প্রথম তিন কিলোমিটার রাস্তা রীতিমত কষ্টকর। মিনিট দশেক অন্তর অন্তর হাঁপাতে হাঁপাতে বসে পড়ছি বসার মতো জুৎসই একটা পাথর পেলেই। মোহন বারবার এসে কাছাকাছি দাঁড়াচ্ছে আর উৎসাহ জোগাচ্ছে। কথায় কথায় মোহন যা বলল, যে কোনও নারীবাদী রেগে যাবেন সেটা শুনলে। ওদের কথায় সান্দাকফুকে নাকি বলে ‘লেডিজ ট্রেক’। মানে এতটাই সহজ যে মেয়েরাও নাকি তরতরিয়ে উঠে যেতে পারে এই রাস্তায়। আর আমরা চার-চারটে জোয়ান ছেলে নাকি বেদম হয়ে হাঁপাচ্ছি! ভোকাল টনিক কাজ দিল কি না জানি না, এ কথা শোনার পর থেকে ওই রকম নাদুস-নুদুস ভুঁড়ি নিয়ে আমাদের সব্বাই কে পিছনে ফেলে হনহনিয়ে হাঁটা শুরু করল শীর্ষেন্দু। ওরে থাম রে, আস্তে চল জাতীয় আবেদন-নিবেদনে কর্ণপাত না করে যখন ও বেশ কিছুটা এগিয়ে চোখের আড়ালে, তখন উত্তেজিত গলায় চিৎকার শুনে প্রথমটায় ভাবলাম, পা হড়কে পড়ে-টড়ে গিয়েছে বোধহয়। এখানে কোনও বিপদ আপদ হলে ভরসাতো শুধু মোহনই। ওর দিকে সবাই একসঙ্গে তাকাতেই খৈনি ডলতে ডলতে নির্বিকার মুখে মোহনের অনুমান, ‘শায়দ এভারেস্ট দিখ গয়া হোগা। ওয়েদার আচ্ছা রহনে সে কভি কভি সামনেওয়ালা মোড়সে এভারেস্ট দিখ যাতা হ্যায়।’

এবং সে অনুমান নির্ভুল।

সামনের মোড়টা বেঁকতেই ঝলমলানো এভারেস্ট চোখ ধাঁধিয়ে দিল। পরের পাঁচ মিনিট শুধুই জিকোর নতুন কেনা ক্যামেরায় ক্লিক ক্লিক আর ক্লিক। এতক্ষণের ক্লান্তি, মোহনের টিটকিরি, পায়ের ব্যথা আর কাঁধের ভারি ব্যাগ সব মিথ্যে। সত্যি শুধু মাথার উপরে সকাল দশটার এই ঝকঝকে রোদ্দুর আর চোখের সামনে হাতের নাগালে এই এভারেস্ট।

এর পর, মোহনকে আর তাড়া দিতে হয়নি। কতক্ষণে পাহাড়ের আরও কাছাকাছি পৌঁছব সেই তাগিদে আমাদের পা চলেছে ঝড়ের গতিতে। মাঝে শুধু একটা গ্রামে মিনিট দশেকের চা পানের বিরতি। তার পর ফের খাড়াই বেয়ে ওঠা। গতি কমল সুকিয়াপোকরি লেকের কাছে এসে। ছোট্ট একটা জলাশয়। আয়তন বা গভীরতায় কোনও একটা ডোবার থেকে বেশি নয়। তবু সেটাই স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে দারুণ ভক্তির জায়গা। কারণ, এর জল না কি চরম ঠান্ডাতেও জমে যায় না। অলৌকিক কি না সে নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো মানসিক অবস্থা নয় তখন। তখন পা চাইছে আর একটু বিশ্রাম। অগত্যা সুকিয়াপোকরি লেককে বাঁয়ে রেখে ডানদিকে সুকিয়াপোকরি গ্রামের দিকে গেলাম।

সেখানেই প্রথম ইয়াক দর্শন। পাহাড়ের প্রায় সমতল ঢালে নির্বিকার মুখে ঘাস চিবাচ্ছে বৃহদাকার জন্তুগুলো। বিনায়কের গলায় ক্যামেরা। শাটারে আঙুল সুড়সুড় করছে। আরও কাছাকাছি গিয়ে ছবি তোলা যায় কি না, বিনায়কের এই প্রশ্নের উত্তরে এক সুকিয়াপোকরিবাসিনী বরাভয় দিলেন। বললেন ওঁদেরই পোষা ওটা। নিতান্ত নিরীহ। বেশ একদফা ফটোসেশন হল ইয়াকের আশেপাশে। সুকিয়াপোকরি গ্রামটা সম্পর্কে কোনও বিশেষণ বরাদ্দ করতে অপারগ আমি। স্রেফ একটা বিশেষ্য লটকে দিতে পারি সুকিয়াপোকরি নামের পাশে – তিব্বত। একটানা খাড়াই পাহাড়ের মাঝে ওই রকম একটা অপ্রত্যাশিত সমতল চোখ এবং পা দুয়ের ক্ষেত্রেই একটা রিলিফের কাজ করে। কলকাতার ধুলো-হাওয়ার অভ্যস্ত চোখ জুড়িয়ে গেল এখানে। কারণ, এই রকম ঘন নীল আকাশ আমি কোথথাও দেখিনি। আর একদফা চা এবং মোমো গলাধঃকরণের পর ফের হাঁটা শুরু। ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে এসে যখন চৌরিচকে থামলাম, তখন সন্ধ্যে নামছি-নামব করছে।

চৌরিচকে রাতের খাবারে ভাগ্যে জুটল ডাল ভাত আর ইয়াকের মাংস। আমি কাঠ বাঙাল। ঝালে ডরাই না। তবু আমারই যেন মনে হল জিভ পুড়ে যাচ্ছে। তবে মানতেই হবে, ওই রকম হাড় হিম করা ঠান্ডার মধ্যে ইয়াকের মাংসের ঝালটাই যেন দরকার ছিল। বাঙালির ছেলে বাইরে বেড়াতে গেলে মা-বাবার চিন্তা শতগুণে বেড়ে যায়। তার উপরে মানেভঞ্জনের পর থেকে মোবাইলের টাওয়ার উধাও। মিনিট পিছু ১৫টাকার চুক্তিতে ভাল আছি-হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে না-ঠান্ডা লাগেনি ইত্যাদি ইত্যাদি ‘অতিপ্রয়োজনীয়’ খবর বাড়িতে জানিয়ে লেপের তলায় সেঁধিয়ে গেলাম। ঝালের জ্বালায় হুশ-হাশ করব, না কি ঠান্ডা কাটাতে মরে গেলাম-জমে গেলাম করব, ঘুম এল সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই।

পরদিন সকালে হাঁটা শুরু সাড়ে আটটায়। শুরুতেই মোহন জানিয়ে দিল, আমরা যেন আজ ধৈর্য না হারাই। কারণ, শেষের রাস্তাটুকু নাকি একটু কঠিন। হাঁটা শুরুর মিনিট কুড়ির মধ্যেই সে কথা মালুম হল হাড়ে হাড়ে। খেলাধুলোটা এখন আর নিয়মিত না হলেও টুকটাক ফ্রি হ্যান্ড রোজই করি আমি। তা সত্বেও আমারই অবস্থা রীতিমত সঙ্গীন। বিনায়ক আবার ‘আদরে মানুষ’। এটা ওর স্বঘোষিত অবস্থান ধরে নিয়ে ওর ব্যাগের মালপত্র হালকা করে দেওয়ার প্রস্তাবে আমরা সাড়া দিইনি কেউই। কিন্তু এখন ও যে ভাবে হাঁপাচ্ছে তাতে ওকে দেখে করুণা হল। ওর ব্যাগটা আরও কিছুটা হালকা করে দিয়ে ফের শুরু হল হাঁটা। সান্দাকফু পৌঁছে গেলাম বিকেল বিকেলেই।

এই প্রথম হোটেল বলার মতো কিছু একটায় মাথা গোঁজার ঠাঁই হল আমাদের। মোহন চৌকস ছেলে। আমাদের পকেট ঝড়ের গতিতে ফাঁকা হচ্ছে জেনে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে দরদাম করে ৫০০ টাকায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিল একটা চলনসই হোটেলে। কিন্তু বসার উপায় নেই। মোহন বলল, ‘আপলোগ সানসেট নেহি দেখোগে ক্যা?’ ব্যাগ রেখেই ওর পিছু ধরলাম ‘সানসেট পয়েন্ট’-এর দিকে। হোটেল থেকে শ’দুয়েক মিটার হেঁটে যে টিলাটার উপর দাঁড়ালাম সেটা সূর্যাস্ত দেখার পক্ষে আদর্শ। সূর্যাস্ত যে চোখ জুড়িয়ে দেবে, সেটা অনুমান করার জন্য সৌম্যর মতো পাহাড় বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার হয় না। বেনীআসহকলা-র প্রায় প্রত্যেকটারই হাজিরা একবার করে দূরের পাহাড়ের বরফের উপরে রেখে হাই তুলতে তুলতে মুখ লুকাল সূর্য।

টিলা থেকে নেমে হোটেলের সামনে এসে দাঁড়াতেই চমক। আশেপাশের খান তিনেক হোটেলের ব্যাবস্থাপনায় মাঝামাঝি একটা জায়গায় শুরু হয়েছে ক্যাম্প ফায়ার। তাতে ট্রেকারদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন সান্দাকফু চেক পোস্টের আধাসেনা কর্মীরাও। গিটার হাতে বব ডিলান গাইবার ফাঁকে সেখানে আলাপ হল জিম ম্যাকার্থি আর জো ল্যাম্বের সঙ্গে। বছর পঁচিশের এই ঝকঝকে জুটি এসেছে আয়ারল্যান্ড থেকে। পেশায় দু’জনেই গবেষক। নেশা ট্রেকিং। এই বয়সেই চষে ফেলেছে গ্রিস আর আল্পসের যাবতীয় ট্রেকিং রুট। সান্দাকফু কেন? প্রশ্নের উত্তরে জিমের জবাব যেন এলির স্বগোতক্তির প্রতিধ্বনি – ‘কজ ইটস বিউটি ইস প্রাইসলেস।’ মাথায় তখন পরদিন সানরাইজ দেখার তাড়া। ঘুম থেকে উঠতে হবে ভোর চারটেয়। হালকা গল্পগুজবের পর বিদায় জানালেও জো আর জিম ছাড়তে চায় না কিছুতেই। ভারতের পাহাড় সম্পর্কে ওদের অসীম কৌতূহল। সে কৌতূহল কাল সকালে মেটাব আশ্বাস দিয়ে হোটেলে ফিরলাম।

পরদিন সকালে মোহন যখন আমাদের টেনে তুলল বিছানা থেকে, তখন আমার হাতঘড়িতে প্রায় ভোর চারটে। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাথরুমে দৌড়ে দেখছি অনেককেই। এবারে তার উল্টো অভিজ্ঞতা। হোটেল মোটামুটি ভদ্রস্থ মানের হলেও এখানে বাথরুমটা কমন। সানরাইজ দেখার তাগিদে সকালে উঠে দেখি বাথরুমের সামনে লম্বা লাইন। ভিতর থেকে কিছুক্ষণ অন্তর অন্তরই ছিটকে বেরিয়ে আসছেন এক এক জন। সবার মুখেই এক কথা। বাপরে বাপ। জল কী ঠান্ডা! কথাটা ভুল নয়। হোটেলের বাইরে মাটিতে ঘাসের উপরের শিশির কুচো বরফের আকারে জমে রয়েছে। বরফ দেখতে দেখতে গন্তব্য জানিয়ে দিল মোহন। যেতে হবে সানরাইজ পয়েন্টে। সেখান থেকে সাফ দৃশ্যমান স্লিপিং বুদ্ধ। যা কি না আসলে কাঞ্চনজঙ্ঘা সহ ডান-বাঁয়ের খান চারেক শৃঙ্গ। বাঁ পাশে মাকালু, থ্রি সিস্টার্স আর এভারেস্ট। তার চূড়ায় প্রথমে গোলাপি, তার পর কমলা, পরক্ষণেই সোনালি আভার শেষে যখন বরফের আসল রঙটা স্পষ্ট হল, ততক্ষণে জিকো ওর ক্যামেরায় ৬০-৭০ বার শাটার টিপে ফেলেছে। প্রতিটা শটের পর জিকোর রিভিউ দেখানোর তাগিদে আমরা অতিষ্ঠ। ‘দ্যাখ দ্যাখ কী দারুণ উঠেছে’ শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা। বুঝলাম পাহাড়ে অসুন্দর বলে কিচ্ছু নেই। এখানে যে দিকেই ফোকাস করে শাটার টেপা হোক না কেন ক্যামেরার মেমোরি কার্ডে ধরা থাকবে এক একটা মাস্টার পিস। জো আর জিমের অবস্থাও তথৈবচ। অ্যামেজিং, অওসম, মাইন্ডব্লোয়িং এমন কোনও ভালর বিশেষণ নেই, যা গত ঘণ্টা দেড়েকে ওরা ব্যবহার করেনি। বঙ্কিমচন্দ্র পড়ে থাকলে হয়তো ওদের মুখ থেকেই বেরতো, ‘আহা কী দেখিলাম, জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না।’

মুগ্ধতার রেশ কাটার আগেই, মোহন জানাল সাড়ে আটটার মধ্যে আজকের হাঁটা শুরু করতে হবে। গন্তব্য গুরদুম। ১১ কিলোমিটার উৎরাইয়ের রাস্তা পেরতে হবে সিঙ্গালিলা ন্যাশন্যাল পার্কের মধ্যে দিয়ে। ‘নসিব আচ্ছা রহনেসে আপলোগোকো রেড পান্ডা দিখনেকো মিলেগা’ – জানাল মোহন। খাড়াই উঠে উঠে এমন বদভ্যাস হয়ে গিয়েছে যে এবারে উৎরাই বেশ ভোগাল। অবশ্য ভোগান্তি বিশেষ গায়ে লাগল না। তার ক্রেডিট পুরোপুরি জঙ্গলের। কোথাও জঙ্গল এত ঘন যে, রোদ পৌঁছচ্ছে না মাটি অবধি। কোথাও আবার শুকনো হলুদ ঘাস, গাঢ় সবুজ গাছের পাতা টকটকে লাল অনামিকা ফুল আর ঘন আকাশি নীল আকাশ চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছে। চার পাশে চোখ বুলাতে বুলাতে আমরা যখন আক্ষরিক অর্থে ‘স্পিচলেস’ মোহনের মুখ দেখালাম রীতিমত গম্ভীর। কারণ, জিজ্ঞাসা করায় মোহনের আঙুল চলে গেল মাটিতে পড়ে থাকা একটা বিস্কুটের প্যাকেটের দিকে। আমাদেরই মতো কোনও টুরিস্টের কীর্তি। খেয়েদেয়ে আগুপিছু না ভেবেই জঙ্গল নোংরা করে প্যাকেট ফেলে দিয়েছে। এবার চমকাতে হল মোহনকে দেখে। বাকি রাস্তায় যতবার খাবারের প্যাকেট, সিগারেটের কৌটো, নরম পানীয়ের প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনের ব্যাগ চোখে পড়ল ওর, সব কুড়াতে কুড়াতে চলল মোহন। এই নোংরাগুলো যে সব টুরিস্টের অবদান তাদের খিস্তি (গালিগালাজ বললে মোহনের রাগের ঝাঁঝটা ঠিক বোঝানো যাবে না) করতে করতে মোহন বলল, জঙ্গল আছে বলেই মোহনরা খেয়ে পড়ে বেঁচে আছে। বেঁচে আছি আমরাও। শহুরে লেখাপড়া জানা বাবুরা যে কোন আক্কেলে এই আবর্জনা দিয়ে জঙ্গলকে ভরিয়ে দেয়, তা নাকি মোহনের মাথায় ঢোকে না। আর একটা ব্যাপার মাথায় ঢুকছিল না আমারও। প্রকৃতিবিজ্ঞানের যে প্রাথমিক পাঠ আমাদের ঝাঁ চকচকে স্কুলগুলোর ক্লাসরুমে বসে দেওয়া হয়, ক্লাস ফাইভের গন্ডি পার হওয়া মোহন তার প্র্যাকটিক্যাল ইমপ্লিমেন্টেশন শিখল কী করে? ‘প্রশ্নগুলো সহজ/উত্তরও তো জানা’। পেটের তাগিদ। জঙ্গলকে ভালবাসার তাগিদ।

ভাবতে ভাবতে পৌঁছে গিয়েছি গুরদুম। তখন সন্ধে নেমে আসছে পাহাড়ের ঢালের গা চুঁইয়ে। সেদিন লক্ষীপুজো। চায়ের কাপ হাতে ব্যালকনিতে বসলাম যখন, তখন ঝলমলে জ্যোৎস্নায় থইথই করছে আমাদের সে রাত্রের মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের ছাদ থেকে শুরু করে বাড়ির মালকিন পার্বতীর শখের গাঁদা বাগানও। সে রাতে ভোজ হয়েছিল জব্বর। ডাল, ভাত, পাঁপড় ভাজা আর ডিমের ঝোল। গবগবিয়ে ভরপেট খাওয়া প্লাস সারাদিনের ক্লান্তি এড়িয়ে চোখ বারবার যাচ্ছিল বাইরের দিকে। এখানে চাঁদ এমনই ঝকঝকে যে, আমার মতো শীতকাতুরে বেরসিককেও টানছে ঘরের বাইরে।

শীত এড়িয়ে পরদিন চোখ মেললাম সাড়ে সাতটায়। আমাদের ঘুম ভাঙার আগেই সেজেগুজে তৈরি মোহন। মোমো, চা আর পাউরুটি দিয়ে ব্রেকফাস্ট সারতে সারতে ও জানাল, ক্যামেরায় যেন ঠেসে চার্জ দিয়ে নিই। কারণ, পথে পড়বে শ্রীখোলা। নদী আর পাহাড়ের এমন কম্বো প্যাক নাকি এদেশে কাশ্মীর ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না। মোহনের যে অতিরঞ্জনের দোষ নেই সেটা প্রমাণ হল আবার। ঘণ্টা চারেক হেঁটে শ্রীখোলায় যখন থামলাম, মনে হল তুল্যমূল্য বিচারে কাশ্মীর যদি সামান্য এগিয়ে থাকে, তবে তা শুধুমাত্র বরফের দৌলতে। পাহাড়ের মাথা থেকে বরফটুকু চেঁছে ফেলে দিলে বলে বলে শ্রীখোলা ১০ গোল দিতে পারে কাশ্মীরকে। এরই মধ্যে চোখ গিয়েছে শ্রীখোলা ব্রিজের ধারের ছোট্ট ‘হোটেল শোভরাজ’-এর দিকে। সাইনবোর্ডের উপরে খুদে অক্ষরে লেখা সেনগুপ্তা’স। বৈদ্যদের স্বজাতিপ্রীতির কথা সর্বজনবিদিত। আমিও ব্যাতিক্রম নই। মালিক বাঙালি? প্রশ্ন করতেই মোহন আঙুল দেখাল হোটেলের সামনে চেয়ার নিয়ে বসে থাকা মালিকের দিকে। পরিচয় দিতেই হাত ধরে সাদর নেমতন্ন – ‘আসুন। চা খেয়ে যান।’ সব ছেড়ে এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায় হোটেল খোলার কারণ জানতে চাইলে মুচকি হেসে প্রসঙ্গ এড়ালেন শুভাশিস সেনগুপ্ত। পরে রিম্বিকের দিকে হাঁটতে হাঁটতে রহস্যভেদ করল মোহন। চোখ ছোট করে জানাল, দমদমের এই বাসিন্দাটি বাড়ির অমতে লাভ ম্যারেজ সারেন বছর কয়েক আগে। রাগী অভিভাবকরা ভিন জাতে বিয়ে মেনে নেননি। তাই দুত্তোর বলে সব ছেড়ে বেরিয়ে এসে শ্রীখোলায় বাসা বেঁধেছেন কপোত-কপোতী। এমনটাও তা হলে হয়! ভাবতে ভাবতে ফের যাত্রা শুরু রিম্বিকের দিকে।

নির্জনতার স্বাদ যে টুকু চেটেপুটে নিয়েছিলাম, সেটা যে শেষ তা বুঝতে পারলাম রিম্বিকে এসে। আগেই বলেছি, পাহাড়ে অসুন্দর বলে কিছু হয় না। সেই ফর্মুলা মেনেই রিম্বিকও খারাপ নয়। কিন্তু খুঁত একটাই। আগের গ্রামগুলোর তুলনায় বড্ড বেশি ঘিঞ্জি। মোবাইলের টাওয়ার আর ইলেক্ট্রিকের প্রত্যাবর্তন জিকোকে বেশ কিছুটা স্বস্তিতে রাখলেও আমার অফিসের, শীর্ষেন্দুর পেশেন্টদের আর বিনায়কের ঘনঘন বাড়ি থেকে আসা ফোন কপালে ভাঁজ ফেলেছে আমাদের তিনজনের। এর চেয়ে চৈরিচক, গৈরিবাস বা গুরদুমই যেন ঢের ভাল ছিল। পরদিন সকাল সাড়ে ছ’টায় গাড়ি ছাড়বে। ছ’ ঘণ্টার জার্নিতে পৌঁছে যাব সেই নিউজলপাইগুড়ি। রাতের পদাতিক এক্সপ্রেস ধরলে সকাল সকাল শিয়ালদা। আবার শুরু হয়ে যাবে রোজকার অফিস, রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের গতিবিধির উপর চোখ রেখে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকা আর উল্টোডাঙার ভয়াল ভিড়।

রিম্বিকের হোটেলের ঘরে কাঠের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে শীর্ষেন্দু বলে যাচ্ছিল, এপ্রিলে সিঙ্গালিলায় রডোডেনড্রন ফুটবে পাহাড়ের ঢালে লাল-কমলা-হলুদ আগুন লাগিয়ে। ট্রেকারদের ভারি বুটের শব্দে চমকে উঠে গাছের আড়ালে মুখ লুকিয়ে পড়বে রেড পান্ডারা। ঝকঝকে আবহাওয়ায় আমাদের মতো ঘুমঘুম চোখে সানরাইজ দেখতে আসা ট্রেকারদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসবে স্লিপিং বুদ্ধ।

কথা দিচ্ছি সান্দাকফু, এপ্রিলেই আবার আসব।

সমাপ্ত
#দার্জিলিং #সান্দাকফু #ট্রেকিং #নিউজলপাইগুড়ি #স্লিপিং #বুদ্ধ #বরফ #শিলিগুড়ি #মানেভঞ্জন #এভারেস্ট #কাঞ্চনজঙ্ঘা
#Darjeeling #sandakfu #trekking #njp #new #jalpaiguri #slipping #buddha #ice #Siliguri #manebhanjan #Everest #kanchanjangha
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum