Churn : Universal Friendship Log in

PEACE , LOVE and UNITY


Share

descriptionসুন্দরী সিকিমের সঙ্গ - যাপন sundari Sikkim

more_horiz

সুন্দরী সিকিমের সঙ্গ-যাপন  







রিজার্ভেশন করা ছিল চার মাস আগেই। তবুও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চিয়তা। গ্যাংটকে নয়, দার্জিলিংয়ে গন্ডগোল।

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন তাই ,”চল মন, বৃন্দাবন” করে বেরিয়ে  পড়লাম। রাতের পদাতিক  এক্সপ্রেস, শিয়ালদা স্টেশন, পরের দিন সকাল ৯-৩০ নাগাদ নিউ  জলপাইগুড়ি স্টেশন। রাতে জানালার কাচে নাক ঠেকিয়ে মায়াবী চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া গাছপালা, মাঠ, বাড়িঘর, স্টেশনের পিছনে সরে যাওয়া দেখতেও ভারি ভাল লাগছিল। নামলাম যখন, কটকটে রোদ চারদিকে। খালি চোখে তাকানো মুশকিল! ব্যাগ থেকে অতএব…রোদচশমা।
উচ্ছ্বল তিস্তা।

আমাদের প্রথম গন্তব্য গ্যাংটক। শেয়ার গাড়িতে সিট বুক হল। কিন্তু ড্রাইভারদাদা তো সাতজনের গাড়িতে দশজনকে না তুলে নড়বেন না। (এখন থেকে গোটা ভ্রমনপথে এটাই দস্তুর!)। অতএব ঘামতে ঘামতে, বিরক্ত হতে হতে অপেক্ষা করা ছাড়া আর একটা কাজ করা গেল। সেটাও দস্তুর এখন— সেলফি, গ্রুফি। ঘণ্টাদেড়েক কেটে গেছে এর মধ্যে। অবশেষে তিনি চললেন।

নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ইস্টার্ন বাইপাস ধরে শালুগাড়া। সেখান থেকে ১০ নং জাতীয় সড়ক। পাড়ি দিতে হবে ১২০ কিমি। অথচ নড়তেচড়তে পারছি না। ছবি তুলব কী করে!

ডুয়ার্সের জঙ্গল ততক্ষণে ছায়া ঢাকা রাস্তা দিয়েছে। মন তো তার দিকে যাবেই। সেবক রোড ধরে গাড়ি ছুটছে তিস্তাকে ডানে রেখে। রাস্তায় কোথাও কোথাও ধসের চিহ্ন এখনও রয়ে গেছে। গাড়ির গতি কমছে স্বাভাবিকভাবে।
টানেল ধরে।

কিন্তু, ওই যে “আমরা চলি সমুখপানে, কে আমাদের বাঁধবে “-জীবনের  ধর্ম মেনেই  বিপর্যয়কে পিছনে ঠেলে ছন্দে ফেরা। ধস পেরিয়ে তিস্তার বিভঙ্গ আর পাহাড়ি রাস্তার  রূপ দেখতে দেখতে যাত্রা চলল। সেবক হয়ে ছুটছে মানুষ ঠাসা সুমো। দূরে দেখা দিল করোনেশন ব্রিজ। সেতুর আর্চটি নয়নলোভন। কিন্তু ছবি তোলার সুযোগ হয়নি। দেখছি, তিস্তা কখনও কাছে কখনও দূরে। পেরিয়ে এসেছি কালিঝোরা, লোহাপুল, সুনতালে। বেলা গড়িয়েছে দুপুরের শেষদিকে। গাড়ি থামল। ড্রাইভারদাদার চেনা হোটেল। যাতায়াতের পথে এখানেই বোধহয় খাওয়াদাওয়া করেন। হোটেলের নামটা কোথাও দেখতে পেলাম না। তা হোক, নেমে পা-কোমরও তো ছাড়াতে হবে! আমার  পুত্রটি ভাত-ডাল-আলুর কোনও একটি পদ পেলেই খুশি। তার খাবার এল। আমরা নিলাম চা আর সেঁকা পাঁপড়। তিস্তা এখানে অনেক কাছে, রাস্তার একেবারে গা ঘেঁসে। জলের রং হাল্কা সবজেটে।
করোনেশন ব্রিজের বদলি।

বিরতির পর গাড়ি ছুটল তিস্তা ব্রিজ হয়ে চিত্রের দিকে। চলেছি ১০ নং জাতীয় সড়ক ধরেই, তবে রংপো ঢোকার পরে তার নাম গ্যাংটক-রংপো রোড। তিস্তা চলে এসেছে  বাঁদিকে। আমূল বদলেছে তার রূপ। সেবক রোডে তাকে দেখেছিলাম ধীর, শান্ত। এখানে সে উচ্ছ্বল, প্রাণচঞ্চল নৃত্যপটিয়সী কন্যে। মাজিটার, সিংতাম, রাণীপুল, তাডং  হয়ে গ্যাংটকের কাছাকাছি পৌঁছে গাড়ি শম্বুকগতি। স্কুলছুটির সময় তখন। কচিকাঁচা আর অপেক্ষাকৃত বড়রাও বাড়ির পথে। গ্যাংটক ট্যাক্সিস্ট্যাণ্ডে পৌঁছতে প্রায় বিকেল চারটে।

ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলের খোঁজ। ট্যাক্সিচালককে আমাদের চাহিদা জানিয়েছিলাম । উনি যেখানে নিয়ে গেলেন এক দেখাতেই ঠিকঠাক। চালক দীনেশভাই তার আগে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখিয়েছেন। কেমন একঝলক রৌপ্যমুকুটের ঔজ্জ্বল্যে আমাদের স্বাগত জানাল। যে কটাদিন গ্যাংটকে ছিলাম, কাঞ্চনজঙ্ঘা মুখ লুকিয়েছিল মেঘের আড়ালে।
দেখা হল।

মখমলি সবুজ আচ্ছাদনে নিজেদের ঢেকে উপস্থিতি জানান দিচ্ছে পর্বতশ্রেণী। খোলা জানালা দিয়ে তাকিয়েছিলাম তার দিকে, অপলক। কর্তা তখন ফ্রেশ হচ্ছেন, ছেলে টিভির সামনে। নিসর্গের থেকে টিভিই এখন ওকে বেশি টানে। যদিও বেড়াতে যাওয়ার আগ্রহ আঠারো আনা।…

ম্যালের পোশাকি নাম এম জি মার্গ। রাস্তায় ছোট গাড়ির লাইন, দু’ধারে একতলা দোতলা বাড়িতে হরেক কিসিমের দোকান, রেস্তোঁরা, শপিংমল, ক্যাসিনো। একধারে দোকানের পরে লম্বা দূরত্ব নিয়ে হাঁটা এবং বসার সুদৃশ্য জায়গা। অক্টোবরের সন্ধ্যায় জমজমাট ম্যাল। লক্ষণীয়, এখানকার বেশিরভাগ দোকানের কর্ণধার মহিলা। তা সে পোশাকের দোকানই হোক, কী মনিহারি অথবা খাবারের দোকান। একটা ফাস্টফুডের দোকানে ফুচকাও বিক্রি হচ্ছে! দাঁড়িয়ে পড়লাম লাইনে। হাতে এল শালপাতার বদলে প্লাস্টিকের বাটি। ফুচকা পাহাড়ে, সমতলে যেকোনও জায়গাতেই স্বাদু। তাই আলুর মশলায় পেঁয়াজকুচির উপস্থিতিও বেশ লাগল। ফুচকা পর্বের পরে মন্দগতিতে হাঁটা। অনেক ভিড়ের মধ্যে আমরা ক’জন।
তাশি ভিউ পয়েন্ট।

কিছুক্ষণ ম্যালে ঘোরাঘুরি, ছবি তোলা, মিউজিক্যাল চেয়ারের মতো বেঞ্চ দখল করে আড্ডা দিয়ে ফিরলাম হোটেলে।

পরের দিন সকাল ৯টা নাগাদ বেরোলাম। দীনেশভাইকেই বলা ছিল। প্রথমেই গেলাম ফ্লাওয়ার এক্সিবিশনে। খানিকটা গ্রিন হাউসের আদলে ঢাকা জায়গায় বিভিন্ন ধরনের ফুলের গাছ, ক্যাকটাস, ইনকা, পমপম, পিটুনিয়া ইত্যাদি চেনা নাম ছাড়াও অনেক অচেনা ফুল, এখানে। রয়েছে একটি কৃত্রিম ছোট্ট জলাশয় এবং একটি ছোট্ট সাঁকো।

ওখান থেকে বেরিয়ে যে জায়গায় পৌঁছলাম সেখানে গণেশজীর মন্দির আছে। গণেশ তক, জায়গাটার নাম। এই মন্দিরটিকে ওয়াচটাওয়ারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। এখান গ্যাংটক শহরটার বেশ পরিচ্ছন্ন প্যানোরামিক ভিউ পাওয়া যায়। মন্দির দর্শনের পরে  স্থানীয় পোশাকে ফোটোসেশন পর্ব। ততক্ষণে খিদেও পেয়ে গেছে। সামনেই একটা খাবারের দোকানে গরম আলুপরোটা আচার, সবজি সহযোগে খাওয়া হল। সঙ্গে কফি  এবং জানালা দিয়ে পাহাড় দর্শন।

পরের গন্তব্য প্ল্যান্ট কনসার্ভেটরি। চোখ পড়ল রডোডেনড্রনে। এযাবৎ শুধু নাম শুনেছিলাম, এখন দেখলাম। তবে ‘উদ্ধত যত শাখার শিখরে রডোডেনড্রনগুচ্ছ’ দেখার সাধ পূরণ হল না। কেন না, এখন ফুলের সময় নয়। কনসার্ভেটরিতে সিকিমের স্বাভাবিক উদ্ভিদের অধিকাংশ রয়েছে।


কনজার্ভেটরির ভিতরে একেবারে উপরের প্রান্তের দিকে রয়েছে একটি প্রাকৃতিক জলধারা। ছোট্ট, কিন্তু তাকেই বেশ সুন্দর করে সাজিয়ে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে। গাছপালার পরিচর্যায় এ জল কাজে লাগানো হয়।

বেরিয়ে আবার গাড়িতে। পথের পাশে পাহাড়ি ঝোরা। বেশ গতিতে লাফাচ্ছে অনেকগুলো ধাপে ধাপে। একটু স্পর্শ করে এলাম।…

তাশি ভিউ পয়েন্ট থেকে গ্যাংটক শহরটা আর কাঞ্চনজঙ্ঘা দুই-ই দেখা যায়।তবে মেঘপিয়নের বদান্যতায় ও রসে বঞ্চিত হয়ে খালি চোখেই ফিরতে হল। একেবারেই খালি চোখ নয়। এই যে মেঘের সান্নিধ্য পাওয়া, গোটা সফরে উপভোগ করেছি। আর কোথায় সে একেবারে আপাদমস্তক আমাদের লুকিয়ে ফেলেছিল তার মধ্যে, সেকথা ক্রমশঃ প্রকাশ্য।


সিকিম প্রধানত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাজ্য। তাই এখানে মনাস্ট্রির প্রাচুর্য। গোনজাং মনাস্ট্রির প্রবেশপথে সুদৃশ্য তোরণ। ঢালপথে হেঁটে বেশ খানিকটা নেমে তবে মূল মনাস্ট্রি। মেঘ হারিয়ে ততক্ষণে রোদ এসে পড়েছে। অপূর্ব কারুকাজের মনাস্ট্রি। প্রাঙ্গনটিও বিরাট। দু’জন করে লামা শিক্ষার্থী তখন বিরাট বিরাট কার্পেট রোদ্দুরে মেলতে, ঝেড়ে গুছিয়ে তুলতে ব্যাস্ত। আমার কর্তা উঠে গেলেন মনাস্ট্রির ভিতরে। আমি আর ছেলে বিরাট প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে পাহাড়ি সৌন্দর্যের দিকে হাঁ করে রইলাম।

‘মগ্ন হয়ে রইব কোথায়?

সময় ডাকে ঘড়ির কাঁটায়।’

সিকিম হ্যান্ডলুম ও হ্যান্ডিক্রাফটসের দিকে যেতে যেতে রাস্তায় পড়ে বাকথাং ফলস্। মনোলোভা তিনি আনন্দে ঝাঁপ দিচ্ছেন। সেই সঙ্গে অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছেন পুষ্পরেণু জলকণা। এঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটিয়ে পৌঁছলাম হ্যান্ডলুম ও হ্যান্ডিক্রাফটে।

সেখানে তখন দ্বিপ্রাহরিক বিরতি চলছে। অগত্যা অপেক্ষা। এই ফাঁকে চিড়িয়াখানায় যাওয়া নিয়ে দর কষাকষি হয়ে গেল দীনেশভাইয়ের সঙ্গে।

কাউন্টার থেকে টিকিট নিয়ে ঢুকলাম হ্যান্ডিক্রাফটের ভবনে। প্রথমেই সংগ্রহশালা। প্রধানত বুদ্ধদেবের বিভিন্ন ছবি, মূর্তি, পুরনো সিকিমের অস্ত্রশস্ত্র, বাসনপত্র, পোশাক, ইত্যাদি সংরক্ষণ করা হয়েছে। সংগ্রহশালার ভিতরে কথা বলা মানা। জানা গেল, এখানে রাখা বুদ্ধদেবের কোনও কোনও ছবিতে ভেষজ রং এবং সোনার গুঁড়ো ব্যবহৃত হয়েছে। ছবিগুলো শতাব্দীপ্রাচীন। অন্যদিকে একটি ঘরে চলছে আঁকার ক্লাস। অন্য আর  একটি ঘরে মেয়েরা বিভিন্ন হাতের কাজ করছে। বাঁশের খোল দিয়ে পেনদানি, ফুলদানি তৈরি, কাগজের মণ্ডের মুখোশ, কাপড়ের ফুল, ব্যাগ ইত্যাদি। চলছে হস্তচালিত তাঁতও। তাৎপর্যপূর্ণভাবে কর্মচারীদের অধিকাংশই মহিলা।

আজকের শেষ গন্তব্য, হিমালয়ান জুলজিক্যাল পার্ক। এই জু-গার্ডেনের বিশেষত্ব হচ্ছে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশে জীবজন্তুদের রাখা। তবে বেশি জীবজন্তু এখন নেই। স্বাভাবিক প্রাকৃতিক বাসস্থানে এরা যথেচ্ছ ঘোরাঘুরি করে। কাজেই দর্শন পেতে  গেলে ধৈর্য রাখতে হয়। ক্যামেরাবন্দি করা আরও দুরুহ। দেখা পেলাম নীলগাই, চিতা, লাল পাণ্ডা, ঘরাল, ক্লাউডেড লেপার্ড, লেপার্ড ক্যাট, সজারুর। পাখিরালয়ে ছুটোছুটি ওড়াউড়ি করে বেড়াচ্ছে লেডি আমহার্স্ট ফেজেণ্ট, গোল্ডেন ফেজেন্ট, ময়ূর। পশুপাখিরা প্রত্যেকে রয়েছে বিভিন্ন পাহাড়ি উচ্চতার বাসস্থানে। সবথেকে উঁচু জায়গায় থাকার কথা স্নো লেপার্ডের। এখন তার জায়গা শূন্য। এখানেই রয়েছে ওয়াচটাওয়ার। সেটিও এখন তালাবন্ধ।

জু-গার্ডেনের রেস্টুরেন্টে মোমো, অমলেট আর ভেজ ফ্রায়েড রাইস দিয়ে বৈকালিক ভোজন সারলাম সপরিবারে।

এবার হোটেলে ফেরার পালা।




Last edited by Admin on Mon Mar 19, 2018 12:26 pm; edited 1 time in total

descriptionRe: সুন্দরী সিকিমের সঙ্গ - যাপন sundari Sikkim

more_horiz

সুন্দরী সিকিমের সঙ্গ-যাপন—দ্বিতীয় পর্ব




পরেরদিন কলটাইম ছিল সকাল ৮টায়। বাজরা-ছাঙ্গু ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে পৌঁছে ড্রাইভারসাবকে ফোন করা গেল। এল অপেক্ষার নির্দেশ। এই ফাঁকে গিয়ে দাঁড়ালাম রেলিংয়ের ধারে। সকালের মিষ্টি রোদ ছেয়ে আছে পাহাড়ের গায়ে। দূরে ধাপে ধাপে ছোট্ট ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। গাছপালা জঙ্গলে আধ-ঢাকা। দেখতে দেখতেই একটু একটু করে মেঘ জমতে থাকল দূরের গাছগুলির ওপরে। সে মেঘের ছায়া দীর্ঘতর হয়ে ঢেকে দিল কিছু গ্রামকে। হঠাৎ দেখলে ভুল হয় বরফ বলে।…

আমাদের গাড়ি গড়াল নাথুলার পথে। পাহাড়ি রাস্তায় ঘুরে ঘুরে যত উপরে উঠছি অপূর্ব সুন্দর প্রকৃতি পরত মেলছে। চিরহরিৎ অরণ্যের আস্তরণে পাহাড়, রুক্ষ পাহাড়, তাদের গা বেয়ে নেমে এসেছে ছোট বড় অসংখ্য ঝোরার উজ্জ্বল রুপালি প্রবাহ। তাদের কেউ কেউ মাঝে মাঝে রাস্তার গায়ে হাজির। নীচে অসাধারণ উপত্যকার দৃশ্য। ক্ষণে ক্ষণে মেঘেদের জমাটি খুনসুটির আসর দেখতে দেখতে সর্পিল পাহাড়ি পথে উঠে এসেছি প্রায় ১৩ হাজার ফুট।


মাঝে একবার আধঘণ্টার বিরতি। পেটে তখন ছুঁচোর দৌড়। ড্রাইভারদাদা যেখানে নিয়ে গেলেন খাবার বলতে মেলে বাঁধাকপি দিয়ে ম্যাগির ঝোলের মত একটি পদ, ভেজ মোমো আর জ্যাম-পাঁউরুটি। ম্যাগি আর মোমো ‘কানামামা’র শূন্যস্থান পূরণ করল। দোকানের মালকিন বেশ স্মার্ট। এখানে শীতের পোশাক ভাড়াও পাওয়া যায় ১০০ টাকায়। খাওয়ার মাঝেই বৃষ্টি নামল ঝিরঝিরিয়ে। ঠান্ডাও নিজের জোর দেখাতে শুরু করল।

এই প্রায় ১৩ হাজার ফুট উচ্চতায় চেকপোস্টে চূড়ান্ত অনুমতিপত্র নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছে গাড়ি। কিছুক্ষণ সময় লাগবে। আমরাও গাড়ি থেকে নেমে এলাম। পূর্ব সিকিমের এসব এলাকা পুরোপুরি সেনা অধ্যুষিত। যেখানে সেখানে ফোটো তোলা বারণ। অথচ অপূর্ব প্রকৃতি। দেখতে দেখতে হালকা মেঘ ছেয়ে ফেলল পুরো এলাকা। সঙ্গে সঙ্গে ইলশেগুঁড়ি। দৌড়ে গাড়িতে।

গাড়ি ছাড়ার মিনিট পনেরোর মধ্যেই নাথুলা পাসের পাদদেশে। এখান হেঁটে উঠতে হবে। ক্যামেরা নিয়ে যাওয়ার অনুমতি নেই। গাছপালা এখানে প্রায় নেই বললেই চলে। দ্রুত হাঁটলে শ্বাস নিতে রীতিমত কষ্ট হচ্ছে। সেইসঙ্গে কনকনে ঠান্ডা। কেবল মুখটুকু ঢাকা ছাড়া। তাতেই মনে হচ্ছে নাকের উপরের অংশ জমে যাচ্ছে। শেষপর্যন্ত উঠে এলাম সীমান্ত প্রাঙ্গনে। একেবারে লাগোয়া চিনের সীমান্ত অফিস। রয়েছে দু’দেশের যাতায়াতের একটি সিঁড়ি। ও প্রান্তে টহলদারিতে চিনা সেনা। পোশাকের রং একটু হালকা। মানস কৈলাস যাত্রায় এই পথেই চিনে প্রবেশ করতে হয়। তাছাড়া অন্যান্য সময়ে দু’দেশের পর্যটকরাই এই পথটুকু পেরিয়ে অন্য দেশের মাটিতে পা রাখতে পারেন। কিন্তু এবারের ব্যাপার আলাদা। ডোকালাম নিয়ে অশান্তিতে উত্তেজনা রয়েছে। তাই মাঝখানের দরজা বন্ধ। বাতিল হয়েছে মানস কৈলাস যাত্রাও। জওয়ান ভাইদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভারতের শেষ প্রান্তের মাটিকে আরও একবার ছুঁয়ে নেমে এলাম। গাড়ি রয়েছে কিছুটা দূরে। এই রাস্তাটুকুতে ফোটোসেশন চলল ।
মেঘের ঘেরাটোপে ভিজতে ভিজতে যখন বাবামন্দির এসে পৌঁছালাম হালকা রোদেলা হাসি ছড়িয়েছে ততক্ষণে। ১৪,৪০০ ফুট থেকে তখন নেমে এসেছি কমবেশি হাজার ফুট। ঘড়ির কাঁটা দুপুর ১২টা ছুঁতে যাচ্ছে। শহিদ হরভজন সিংয়ের স্মরণে নির্মিত মন্দিরপ্রাঙ্গনে তেরঙ্গা উড়তে চলেছে। পতাকা উত্তোলক জওয়ানের সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের পর্যটকের প্রায় শতকণ্ঠে ধ্বনিত হল জাতীয় সঙ্গীত। জাতীয় সঙ্গীত তো অন্য সময়েও গেয়ে থাকি। তবে এখন অন্যরকম অনুভূতি জুড়ে গেল।

মন্দির পিছনদিকের পাহাড়ে ধাপে ধাপে শহিদস্মৃতি। শহিদদের নাম, রেজিমেন্ট, কার্যকালের ফলক। সামনে বিস্তীর্ণ উপত্যকা, মেঘ-রোদের গলাগলিতে মোহাবিষ্ট করে দিচ্ছে। বাঁদিকে একটু দূরে শিবমন্দির। মন্দিরের মাথায় শিবের মূর্তি। তার পিছনদিকে অনেক উপরের পাহাড় থেকে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে নামতে থাকা দুগ্ধফেননিভ ঝর্ণা। ডানদিকের রাস্তা ধরে একটু এগোলেই পাওয়া যেত রেশম পথের দিশা। আমরা বাঁদিক দিয়ে উঠে ছাঙ্গু লেকের রাস্তা ধরলাম। পোশাকি নাম সোমগো। অপভ্রংশ হতে হতে ছাঙ্গু। ১২,৪০০ ফুট উঁচুতে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক হ্রদ। স্থানীয়রা সাজিয়ে গুজিয়ে ইয়াক নিয়ে দাঁড়িয়ে। রোপওয়েও আছে। আমাদের সঙ্গী এক নবদম্পতি কখন সেদিকে পা বাড়িয়েছেন। গাড়ি ছাড়ার সময় দু’জনকে আর পাওয়া যায় না। খোঁজ খোঁজ রব। অবশেষে একজন নববধূর লাল জ্যাকেট দেখতে পেয়ে উত্তেজিত স্বরে বললেন, ‘ওই ওখানে!’ জ্যাকেটটা সেই দোকান থেকে ভাড়া নেওয়া। ভাগ্যিস!

শেষ বিকেলে ফেরা। গাড়ি থেকে নামতেই আবার ঝুপঝুপিয়ে বৃষ্টি।

সকাল ৭টা। লক্ষ্য উত্তর সিকিম। আবার চড়াই। পাহাড়ের গা ঘুরে ঘুরে উঠে যাচ্ছি। মেঘেরা তখন নীচে, গাছেদের মাথায় মাথায় জমাট বেঁধে আছে। বাইরে ইলশেগুঁড়ির অবাধ নৃত্য। হঠাৎ আমার ছেলে প্রশ্ন করল, ‘মেঘ তো আমাদের নীচে তাহলে বৃষ্টি কী করে হচ্ছে?’ উত্তর পেয়েই চোখটা গাড়ির কাচে ঠেকিয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে মিলিয়ে নিতে চাইল। হাসি মজায় চলতে চলতে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল এক জায়গায়। সামনে দু’তিনটে গাড়ি, উল্টোদিকেও। রাস্তা সারানো হচ্ছে। বৃষ্টির মধ্যে, এত ঠান্ডাতেও কাজের বিরাম নেই। এসব পেরিয়ে চা’ বিরতি পাওয়া গেল যেখানে সে জায়গার নাম ‘কবি’। দুটো দোকান পাশাপাশি। খাবার ছাড়াও রয়েছে শীতবস্ত্রও। রয়েছে ছোটখাট জলপ্রপাত। সগর্জনে ঝাঁপ দিচ্ছে। বৃষ্টি দেখছি সারাক্ষণের সঙ্গী। প্রকৃতির অনবদ্য সৌন্দর্যে সে-ও একটা আলাদা মাত্রা বটে। ‘কবি’ থেকে যাওয়ার পথে জায়গায় জায়গায় ধাপচাষ। ধান, ভুট্টার সঙ্গে রয়েছে হরেক ফুলও। বহুবর্ণের বৈচিত্রে চোখ ঝিলমিল। বাঁকে বাঁকে দেখা দিচ্ছে বিস্তীর্ণ পর্বতমালা। নীচের উপত্যকায় বয়ে যাচ্ছে ক্ষীণবপু খরস্রোতা নদী, উচ্চতার ফাঁক রেখে তুষারশুভ্র মেঘও যেন নদীর মতোই ভেসে আছে। মাঝে মাঝেই ছোটোবড় ঝোরা নেমে মিশেছে ক্ষীণকায়া নদীতে।…
খাওয়া শেষে বেরিয়ে দেখা এক সারমেয় শাবকের সঙ্গে। ভারি মিষ্টি আর বাধ্য। পিছু পিছু ঘুরছিল। বললাম, ‘বোসো চুপটি করে।’ তা দিব্যি পোজ দিল।

ঘণ্টাখানেক পরে মঙ্গন বাজার পেরোলাম। এই এলাকাটা তুলনামূলক জমজমাট। দোকানপাট সব খোলা। কিছুটা গিয়ে আবার এক উচ্ছ্বল নৃত্যাঙ্গনার সঙ্গে খানিক আলাপচারিতা। পরের চেকপোস্টে উত্তর সিকিমে ঢোকার চূড়ান্ত ছাড়পত্র মিলল। তখন বিকেল ঘনিয়ে এসেছে। রাস্তা মাঝে মাঝে সংকীর্ণ আর অজস্র চুলের কাঁটার বাঁক পেরিয়ে লাচুংয়ে যখন চারিদিকে সন্ধ্যার মতো ঘোর। যে হোটেল ঠিক ছিল তার পিছনে পাহাড় থেকে নেমে আসছে এক কলস্বরা। এরপর যতক্ষণ এখানে থাকব সে দু’কান ভরে থাকবে। অবিরাম ধারাপাত চলছে। পাল্লা দিয়ে ঠান্ডা। হাড়ে কাঁপুনি লাগছে। কাঠের ঘর টিমটিমে বাল্ব, টিনের চালে বৃষ্টির নিক্কন বেশ একটা পরবাসী পরবাসী অনুভব। গরম চা ঘর পর্যন্ত পৌঁছতে পৌঁছতে ঠান্ডা সরবত। রাতের খাবার ডাইনিং হলে গিয়ে খেতে হবে। খানিকটা উঠোন পেরিয়ে যেতে গিয়ে রীতিমত কেঁপে গেলাম। নিচু অথচ চওড়া বেঞ্চে বেশ গদিমত বসার জায়গা তিন দেওয়াল জুড়ে। বেঞ্চের সামনে একই মাপের টেবিল। দেওয়ালে দেওয়ালে বিভিন্ন প্রজাতির অর্কিড, রডোডেনড্রন ও অন্যান্য পাহাড়ি ফুলের ফোটো। তিনজন সাহেবও এসেছেন দেখলাম। গরম গরম রুটি, ভাত আর মাংসের ঝোল। পানীয় মিনারেল ওয়াটার— ঝর্নার জল গরম করা। হাত ধোয়ার জায়গায় একটা বড় ড্রামে ধরে রাখা বৃষ্টির জল।

পরের দিন ভোর পাঁচটায় বেরোনো। ঘরের বাইরে পা রাখতেই দেখি সামনের পাহাড়ের মাথায় বরফের হালকা টুপি। বৃষ্টি থেমেছে। আলতো আলোয় চারিদিক দৃশ্যমান। বেরিয়ে পড়লাম। এতদঞ্চলের স্বাভাবিক রাস্তায় মাঝে মাঝেই ফুটন্ত তেলে পাঁপড়ের মতো নাচতে নাচতে গাড়ি চলছে। ভিতরে আমাদের অবস্থাও তথৈবচ। হেলিপ্যাড গ্রাউন্ড, সেনাচৌকি, টহলদার সেনা, রাস্তার উপর দিয়ে বয়ে চলা প্রবল জলস্রোত পেরিয়ে ইয়ুমথাং। মহিলাপ্রধান শপ। এখান থেকে প্রত্যেকেই গামবুট ভাড়া নিলাম। কেউ কেউ জ্যাকেটও। যাব জিরো পয়েন্ট বা আইস পয়েণ্ট। আগের দিনও রাত সারাক্ষণ বৃষ্টি হয়েছে। তাই আজ বরফ খেলা যাবে আশ্বাস পাওয়া গেল। এতক্ষণ মখমলি রুপ দেখানো পাহাড়সারি এবার রুপোলি পোশাকে সেজেছে। আইস পয়েন্টের অনেক। আগে থেকেই রাস্তার দু’পাশে বরফ দেখতে পাচ্ছি।

এত তুষারপাত হয়েছে শেষ প্রান্তের ৫০০ মিটার আগেই গাড়ি থেমে গেল। তারপর যেদিকে তাকাই পাহাড়ের মাথায় মাথায় রৌপ্যমুকুট ঝলকাচ্ছে। কয়েকটি পাহাড় আপাদমস্তক রুপোয় সেজেছে। তার মধ্যেই কুলকুল করে বয়ে যাচ্ছে এক খরস্রোতা, স্বচ্ছতোয়া। আহা! এত বরফ কখনও আগে দেখিনি। যেন স্বর্গভূমি। হাঁটতে হাঁটতে, বরফ নিয়ে খেলতে খেলতে পোজ দিতে দিতে, ক্যামেরা ক্লিক করতে করতে কেটে যাচ্ছে স্বপ্নের প্রহর। বেরসিক ড্রাইভারভাই ডেকে পাঠাল। গাড়িতে উঠব বলে ফিরছি এমন সময় হালকা তুষারের ছোট্ট ছোট্ট গোল সাবুদানা টুকরো ঝরতে শুরু করল।

প্রায় সাড়ে সতেরো হাজার ফুট উপরে রয়েছি। দমে একটু টান। ড্রাইভার বললেন, এরপর আরও বরফ পড়লে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। তখন কতক্ষণ আটকে থাকতে হবে ঠিক নেই। অগত্যা ফেরা।

যাবার পথে ইয়ুমথাং ভ্যালিতে নামিনি। এবার নামলাম। ইয়ুমথাং উপত্যকা দিয়ে যে মধ্যকায়া স্বচ্ছতোয়া প্রবহমানা, তার নাম লাচুং চু। সে কিছুটা নেমে গিয়ে মিশেছে তিস্তায়। লাচুং চুয়ের চলার পথে বুক পেতে রয়েছে অজস্র ছোটবড় উপলসারি। উপত্যকায় চরে বেড়াচ্ছে ইয়াকও। স্মৃতিচিহ্নের নুড়ি তুলে নিলাম লাচুং চুয়ের অন্তর থেকে ।









descriptionRe: সুন্দরী সিকিমের সঙ্গ - যাপন sundari Sikkim

more_horiz


সুন্দরী সিকিমের সঙ্গ যাপন-তৃতীয় পর্ব





বিষণ্ণ বিকেলের ছায়া দীর্ঘতর হয়ে নির্জীব হলদেটে আলো। প্রত্যেক বাঁকে বাঁকে অন্ধের দিক বদল। সে কিন্তু চোখ ফেরাতে দিচ্ছে না নিজের দিক থেকে। তার পায়ের কাছে শাড়ির পাড়ের মতো নেচে চলা লাচুং চু সঙ্গে চলল। চুংথাংয়ে লাচেন চু ওর সঙ্গে একপ্রাণ হলে নতুন নামে সকলে ডাকবে, তিস্তা। তখন কী উন্মত্ত রূপ তার! কিন্তু অমোঘ আকর্ষণ! বিরাট বড় বড় পাথর-তারাও তার নাচের ধকলে ক্রমশ পরিবর্তিত হতে হতে নুড়ি, তারপর বালি। সে রূপান্তর দীর্ঘসূত্রী। কিন্তু মানুষের লোভের জিভ অনেক লম্বা। তাই যন্ত্র বসেছে নদীর বুক থেকে পাথর তুলে সুবিধামত গুঁড়িয়ে নেওয়ার।

দেখছি লাচেন চু বাঁদিকে চলেছে। আর ডানদিকে মাঝে মাঝেই পাহাড়ি বাঁশের বাহারি জঙ্গল। রাস্তার উপরে ঝুঁকে পড়ে আলো-আঁধারি গ্রামের রাস্তার ভ্রম তৈরি করেছে। কিন্তু এ তো জাতীয় সড়ক!

পাকানো পথের এক বাঁক ঘুরে উঠে দেখি এক মা কোলের বাচ্চাটিকে নিয়ে দিব্যি নিশ্চিন্তে বসে খাদের কিনারে। ওদের পেরিয়ে চোখ হাঁটল উল্টোদিকের পাহাড়ে। সেখানে তখনও পাতলা পরত তুষারের। একটু নীচেই গাছেদের মাথায় মাথায় ছাতার মত মেঘপুঞ্জ। উপরে ঝকঝকে নীল চাঁদোয়া-আকাশ।

সন্ধে নামতে তখনও কিছুটা বাকি। পেরিয়ে এলাম অন্য একটা পাহাড়। থেমেছে যন্ত্রবাহন। চারিদিকে গাছেদের মজলিশ। পথের পাশে নাম না জানা ফুল। লাচেন পৌঁছলাম সন্ধে ছুঁয়ে। কাছেই হাইডেল পাওয়ার প্রোজেক্ট। অথচ লোডশেডিংয়ের দাপট কম নয়। টেবিলে মোমবাতি। জানলা খুলতেই ঘরে মেঘ। তাড়াতাড়ি পাল্লা বন্ধ করে পর্দা সরাই। প্রত্যন্ত এ গ্রাম ততক্ষণে অন্ধকারে ডুবে গেছে। কিন্তু এই অন্ধকারের টানও কি একটু বেশী? হবে নিশ্চই।

হোটেল ‘সো লামো’। আপ্যায়ন হোম স্টে’র। পরনের শীতপোশাক খুলিনি। সঙ্গে একটা লেপ, একটা কম্বলের উষ্ণতা। তা-ও হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি কাঁপুনি।

সকাল পৌনে পাঁচটা। তখনও অন্ধকার লেগে চারপাশে। উল্টেপাল্টে চেখে নেওয়ার আজকের দিন শুরু। প্রকৃতির একেবারে অন্দরমহলের পথ। কী তার বাহার! আলো বেড়ে উঠছে একটু একটু করে। দেখা দিচ্ছে ওদের তুষারঢাকা মাথা। পাকানো রাস্তা ঘুরে উঠতে উঠতে কোনও কোনও বাঁক থেকে দেখছি অনবদ্য ল্যান্ডস্কেপ। ছবির মতো পর্বতমালা। দু’দিক দিয়ে গিয়ে যেখানে মিশেছে তার মাথায় রজতমুকুট। কখনও বা তার আগের কয়েকজনও তাকে সঙ্গ দিচ্ছে। অন্যরা সবুজ ঝালরে ঝলমল করছে। নীচের উপত্যকা দিয়ে বয়ে চলেছে উচ্ছ্বসিত তরঙ্গিনী। যত উপরের দিকে উঠছি তত তার উদ্দামতা বাড়ছে। চলার পথে প্রবল নাচে ভরিয়ে দিচ্ছে দু’চোখ। পাহাড় পেরিয়ে পাহাড় পেরিয়ে গুরুদোংমার রোড। জাতীয় সড়ক। এ পর্যন্ত তার গায়ে পোশাক নেই। ধারে ধারে ইতিউতি দু’তিনঘর বাসিন্দা। কেউ গাই দুইছে, কেউ কাঁচা পাতা জ্বালিয়ে ধোঁয়া দিচ্ছে। নদীর ধারে নেমে যাওয়া বাড়ির উঠোনটিতে কারও একচিলতে চাষবাস। মুলো, বাঁধাকপি, সরষে, গাজর।

দীর্ঘ এলাকা পুরোই সেনাছাউনি। একটু পরপরই পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা রুপোলি ফিতের মত তুষারগলা ধারা। কোনও কোনওটি সরু দড়ির মত। গাঢ় সবুজ মখমলে যেন রুপোলি জরির বুনোট।

দেখতে দেখতে উঠে এসেছি ১৭০০০ হাজার ফুটের বেশি। আমুল বদল ঘটে গেছে প্রকৃতিতে। পাহাড় এখন রুক্ষ সুন্দর। যেদিকে চোখ যায় বরফ মেখে নিশ্চুপ অচলায়তন। সবুজের লেশমাত্র নেই। কোথাও কোথাও ছোট ছোট অগভীর গহ্বরে জমে আছে বরফগলা জল। বিস্তীর্ণ উপত্যকা রুক্ষ। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে সরু জলধারা। মাটির লাগোয়া শুকনো ঘাস খেতে অসংখ্য ইয়াক আপন খেয়ালে চরে বেড়াচ্ছে। রোদ উঠেছে চড়চড়িয়ে। বরফ নেই আজ। আপাদমস্তক বরফের চাদরে সেজে দাঁড়িয়ে আছে ভারত-চীন সীমান্তের পর্বতমালা। তাদের গায়ে প্রতিফলিত হয়ে তেজিয়ান রোদ। ১৭২০০ ফুট। দাঁড়িয়েছি অপরূপের সামনে। তার সৌন্দর্যের কাছে হার মেনেছে শ্বাসকষ্ট। গুরুদোংমার হ্রদ। স্ফটিকস্বচ্ছ জল। হ্রদের তিনদিক ঘিরে তুষারাবৃত পর্বতমালা। মাথার উপরে ঝকঝকে নীল আকাশ প্রতিফলিত হচ্ছে হ্রদের জলে। অসহ্য সুন্দর। আর কি এ জীবনে কখনও তোমার কাছে এভাবে আসা হবে!

তিনদিন পরে আবার গ্যাংটক।এবারের মতো শেষবার সন্ধেবেলার ম্যাল।

নামচি যাওয়ার পথে রোদের মিতালি। কিন্তু শুরুতেই বিপত্তি। চালকের কানে তখন চলভাষ ট্রাফিকপুলিশের তীক্ষ্ণ নজরবন্দি। কোনও কথা নয়, কোনও পারিতোষিক নয়।লাইসেন্সটি জমা দিতে হল।পরবর্তী পথটুকুতে কি তা বলে চলভাষ অচল থাকল? তা নয়, তবে ব্যবহৃত হল নামমাত্র। এ রাজ্য হলে? সে অবান্তর প্রসঙ্গ।

সুন্দরের উপর মন রাখি। বাঁক ঘুরলেই নতুন ছবি। দু’দিকে সুউচ্চ পাহাড়, একেবারে নীচে গভীর উপত্যকা দিয়ে সরু সুতোর মত তিস্তা। বর্ণনা করে বোঝানো যায় না। শুধু মনের সিন্দুকে যত্নে তুলে রাখতে হয়। বাঁকের মুখে নিজে নিজে বেড়ে ওঠা ফুলের গাছ, কসমসের মত দেখতে, হলুদ রঙে চোখধাঁধানো। রাস্তা থেকে উপরের দিকে তাকালে ঢালে ঢালে ছোট ছোট সুন্দর বাড়ি, পরপর স্কোয়াশের চাষ। মাচা ভরে ঝুলে আছে গাঢ় সবুজ, হালকা সবুজ, ঘিয়ে রঙা স্কোয়াশ।

চারধাম, নামচিতে মানুষের তৈরি দ্রষ্টব্য। বছর ছয়েক মাত্র বয়স তার। ধর্মীয় তাস পর্যটনমঞ্চে। নান্দনিক প্রকৃতির মধ্যে মানুষিক নন্দনতত্ব। বিশালবপু কিরাটেশ্বর বহু দূর থেকে নয়নপথগামী। প্রাঙ্গন থেকে দৃষ্টিপথজুড়ে শুধু অপরূপ প্রকৃতিতে মেঘ রোদের লুকোচুরি খেলা। সামদ্রুপসেও এ রকমই। পার্থক্য-সেখানে বুদ্ধদেব আসীন।

রাবাংলাতেও (আসলে রাভং লা) প্রকৃতি অপরূপ। মেঘপিয়নেরা বাহুবল দেখাতে প্রস্তুত। বুদ্ধপার্ক চেখে নেওয়ার অবসরে একেবারে মেঘের ঘেরাটোপে বন্দি হয়ে পড়লাম বেশ কিছুক্ষণের জন্য। অভূতপুর্ব অভিজ্ঞতা।

আপার পেলিংয়ে মূল উদ্দেশ্য কাঞ্চনজঙ্ঘাকে কাছ থেকে দেখা। কিন্তু এত সহজ কি তার দেখা পাওয়া যায়? মেঘের পর্দার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখাই তার দস্তুর। এই ফাঁকে গোটা দিন লোয়ার পেলিং, আপার পেলিং দেখে কাটালাম। লোয়ার পেলিংয়ে রিম্বি ঝরণা মিশেছে গিয়ে রিম্বি নদীতে। রিম্বি নদী চঞ্চল তরুণী। তার তীরে পাহাড়ের ঢালে কমলালেবুর বাগান, এলাচের ধাপচাষ। সবুজ কমলালেবুতে ভরে আছে গাছ। এলাচের দেখা মিলল না। ঢালে কোথাও কোথাও আখরোট ভরা গাছ। কাঞ্চনজঙ্ঘার শরীর থেকে নেমে আসা দুরন্ত কাঞ্চনজঙ্ঘা ফলসের সঙ্গে দেখা হল। আরও আছে মিথ-আদিমতা-জঙ্গলে জড়ামড়ি খেচিওপালরি হ্রদ। শিক্ষার্থী লামা (নিতান্তই অল্পবয়স) এবড়োখেবড়ো বনপথে পিঠে বয়ে নিয়ে চলেছে কাঁচা পাতা, শুকনো ডালপালার ভারী বস্তা। হ্রদের প্রবেশমুখে পুণ্যলোভী পর্যটক। মাছেদের খাবার খাইয়ে মনস্কামনা পূরণে ব্যস্ত। পাহাড় জঙ্গলের মধ্যে স্বাভাবিক প্রস্রবণের জলাশয়। লোকমুখে খেচিপেরি লেক।

শহর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার।আপার পেলিংয়ে এশিয়ার দ্বিতীয় উচ্চতম ঝুলন্ত সেতু সিংসোর ব্রিজ। দৈর্ঘ্যে ২০০ মিটার। ৭২০০ ফুট উঁচুতে ঝুলন্ত। সেতুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক নীচে তাকালে ঝরণা, নদী, অরণ্য উপত্যকার দমবন্ধকরা ফ্রিজশট।

গোছগাছ রাতেই শেষ। সকালের জন্য শুধু স্নান আর জলখাবারের পর্বটুকু রাখা। ভোরবেলা জানলার পর্দা সরাতেই তার আভাস। উত্তেজনায় গলার পারদ চড়ল। অন্য দু’জনকেও হাঁকডাক করে তুলে দিয়ে সকলে মিলে লাগোয়া বারান্দায়। তারপর ঘণ্টাদুয়েক ধরে শুধু তার রূপবদল চাক্ষুষ করা। প্রথম দেখা দিল মেঘের চিকের আড়ালে। ক্রমশ সরল মেঘ। আগুনের গোলার মত সুর্য লাফিয়ে বেরিয়ে এল অন্ধকারের আড়াল ছিঁড়ে। তার মুকুটের রং বদলাতে থাকল। সোনালি মুকুটের বিস্তীর্ণ রেঞ্জ একেবারে চোখের সামনে। ইচ্ছে হচ্ছে হাতটা লম্বা করে বাড়িয়ে একবার ছুঁয়ে দিই।

কাকস্য পরিবেদনা। উপায়বিহীন বলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখে, মনে, সবটুকু সত্তায় শুষে নিতে থাকি অমল সৌন্দর্য্। কাঞ্চনজঙ্ঘার সে ঝলক তোলা রূপ এ জীবনের সম্পদ হয়ে থাকল।
(সমাপ্ত)










descriptionRe: সুন্দরী সিকিমের সঙ্গ - যাপন sundari Sikkim

more_horiz
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum