Churn : Universal Friendship Log in

PEACE , LOVE and UNITY


Share

descriptionকাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour  Emptyকাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour

more_horiz
কাশ্মীর ভ্রমন - 1
...................................................
কাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour  Fb_im106
কাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour  Fb_im107
কাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour  Fb_im108


আর্টিকেল ৩৭০ উইথড্রল নিয়ে সারাভারত উদ্বেলিত। কাশ্মীর আবার সংবাদ শিরোনামে। আর এই সব সময়ে আমার খুব 'কাশ্মীর' পাচ্ছে। আপাতত যখন সেরম কোনও প্ল্যান নেই, তখন মনের সিন্দুক থেকে নামিয়ে মহামূল্যবান স্মৃতির অলংকারগুলোই আরেকবার দেখেশুনে, মুছে-টুছে তুলে রাখা যাক!
......................................

দিল্লী বিমানবন্দরের রানওয়েতে আমাদের বিমানটি গতি নিতেই বুকভরে শ্বাস নিলাম। যাক্, আর মাত্র ঘন্টা দেড়েক পরেই পৌঁছে যাবো আমার আশৈশব স্বপ্নের ভূস্বর্গে। সকলের বারণ অমান্য করে, প্রত্যেকের সাবধানবানী অগ্রাহ্য করে কাশ্মীর যাত্রায় অনড় থেকে গেছি।
অফিসের বাকি সহকর্মীরা যখন এবারকার মত তাদের কাশ্মীর যাত্রা স্থগিত রেখে পুজোয় বেছে নিচ্ছেন অন্য গন্তব্য, আমি তখনও আশা-নিরাশার দোলাচলে দুলতে দুলতে দুবেলা চোখ রাখছি সংবাদপত্রে আর টিভি চ্যানেলে।

২০১৪, অক্টোবরের মাঝামাঝি যাত্রা শুরুর আগে ভরসা বলতে দূরভাষে বলা হাউসবোটের ম্যানেজার আব্দুল ভাইয়ের কথাগুলো,
"বাঢ় তো আয়েগী, যায়েগী! পর, জিন্দেগী নহি রুকেগী, ওহ তো বহতি রয়েগি অপনি খুদ কী লয় মে"!
জীবনের কী অমোঘ সত্য সেদিন তথাকথিত সেই অশিক্ষিত মানুষটির থেকে শিখলাম, তা বুঝতে আরেকটু সময় লেগেছিল।

শ্রীনগর এয়ারপোর্টের বাইরে বেরিয়ে প্রথমেই চোখে পড়ল, বিশাল মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট, রাইফেল হাতে অতন্দ্র পাহারায় সেনা-জওয়ান অার অবিশ্বাস্য রকম শুনশান, জনহীন রাস্তাঘাট। এই মারাত্মক বন্যা শ্রীনগরের শ্রী কে নষ্ট করে ফেলেছে অনেকটাই। রাস্তার দুপাশের হোটেল এবং বাড়িগুলোর দোতলার গায়ে অবধি জলের দাগ এখনও সুষ্পষ্ট। আমাদের হোটেলটি ডালগেটের একদম কাছেই। এখান থেকেই শুরু ডাল বুলেভার্ড রোড আর বাঁদিকে বিখ্যাত ডাল লেক। লেকের জল বন্যার পরে বেশ অপরিষ্কার। হৃদের জলে ভাসমান দারুন সুন্দর কারুকার্য করা হাউস বোটগুলোরও ক্ষতি হয়েছে বিপুলভাবে। বেশিরভাগ হোটেল এবং দোকানপাট বন্ধ। মরসুমের এইসময় যখন বাঙালি পর্যটকের ভিড়ে ডাল রোডে হাঁটা আর বড়বাজারে হাঁটা প্রায় এক হওয়া উচিৎ ছিল, সেখানে এই মুহূর্তে হাতে গোনা কিছু পর্যটক।

অথচ এত কিছুর মাঝেই সেবার উপত্যকার যে অন্য রূপটি আমাদের চোখে পড়েছিল তা সত্যিই ভোলার নয়।
গরীব কাশ্মীরি শাল বিক্রেতা থেকে অতিথি বৎসল হোটেল মালিক,শিকারা চালক, প্রত্যেকের আন্তরিকতা আর অফুরান প্রাণশক্তিতে জীবনের উপর বিশ্বাসটাই ফিরে আসে বারে বারে।
প্রকৃতির ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে লক্ষ লক্ষ টাকার ব্যবসা নষ্ট হবার পরেও এই মানুষগুলো যেভাবে আবার স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে ফেরার চেষ্টা করে চলেছিল, সবকিছু আবার আগের মত করে গড়ে তোলার লড়াই করে চলেছিল তাকে কুর্নিশ জানাতেই হয়।
আমাদের অতি সামান্য অসুবিধেতেই যেভাবে তারা হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছিলেন, তাতে কুন্ঠিত হচ্ছিলাম আমরাই।

বাড়ি ফিরে এসে অনেক নিরালা মুহূর্তে অনাত্মীয় সেই মানুষগুলোর আন্তরিকতা চোখে এনে দিয়েছিল অশ্রু। বিশেষত, বিদায় নেবার আগে আমাদের ট্রিপের ড্রাইভার মজিদ ভাইয়ের শেষবারের মত বলা কথাগুলো, "অগলি বার তুম অকেলি আ জানা। তুমহারা ভাই হ্যায় না ইধার। ডর কী কোঈ বাত হি নহি।"

এত জায়গায় গেছি, কিন্তু মজিদভাইয়ার মত বিনম্র, শান্ত, সুভদ্র ড্রাইভার আর কোথাও, কখনো পাই নি।
এই মানুষগুলোর সহযোগিতাতেই বন্যাবিধ্বস্ত শ্রীনগরে থেকেছি এবং শ্রীনগরকে
কেন্দ্র করেই নির্ঝঞ্ঝাট ঘুরেওছি। বিশেষত ভিড় কম হওয়ায় কাশ্মীরের ভেতরে অন্য কাশ্মীরের রূপটাও চোখে পড়েছে সহজেই।

প্রথম দিনে শ্রীনগর সাইটসিইং এ আমাদের প্রথম দ্রষ্টব্য হল তখত-এ-সুলেমান পাহাড়ের মাথায় শংকরাচার্যের মন্দির। শোনা যায় খ্রীস্টপূর্ব ২০০ সালে সম্রাট অশোকের পুত্র এই মন্দির তৈরি করেন। কাশ্মীর ভ্রমণকালে জ্ঞানতপস্বী শংকরাচার্য দীর্ঘ দিন ধ্যান করেন এই মন্দিরে। ২৪২ টি সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয় মন্দির প্রাংগনে। সেখান থেকে দেখা যায় ঝিলম ও ডাল লেক সহ সমগ্র শ্রীনগরের শহরটিকে।

মন্দির থেকে নেমে ডাল লেককে বাঁপাশে রেখে আমরা ছুটে চললাম রাজকীয় মুঘল গার্ডেন গুলির উদ্দেশ্যে।

পথের প্রথমেই পড়লো 'চশমেশাহি'। সম্রাট শাহজাহানের অামলে এই অপূর্ব উদ্যানটি তৈরি হয়েছে এক প্রাকৃতিক প্রস্রবনকে কেন্দ্র করে। এর কাছেই রয়েছে আরও একটি ছয়মহলা উদ্যান। শাহজাদা দারার প্রিয় 'পরিমহল'। দারাশুকো জ্যোতিষচর্চাকেন্দ্র ও সুফি সাধকদের বাসস্থান হিসেবে এটি নির্মান করান। পরিমহল থেকে দেখা যায় ডাললেক আর দূরের সবজে-নীল পাহাড়।

মুঘল বাদশাহ দের অতিপ্রিয় গ্রীষ্মাবাস শ্রীনগরে রয়েছে আরও দুটি বিখ্যাত প্রমোদকানন--
'নিশাতবাগ' আর 'শালিমার বাগ'।
মুঘল গার্ডেনগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড় 'নিশাতবাগ' নির্মান করেন নুরজাহানের ভ্রাতা আসফ খান। পাহাড়ের ঢালে ১২ টি ধাপে তৈরি এই বাগানের মাঝখানে বয়ে চলেছে পাহাড়ি জলধারা আর উদ্যানের ফোয়ারাগুলো তৈরি হয়েছে সেই জলে। দুপাশে বাঁধানো রাস্তা দিয়ে উঠতেই চোখ জুড়ালো রং-বেরঙের অজস্র ফুলের সমারোহে। বাগান জুড়ে রয়েছে বিশাল বিশাল চিনার, ঝাউ আর সাইপ্রাস। হেমন্তের শেষ বিকেলে লাল হয়ে যাওয়া চিনারের পাতা ঝরে পড়ে বাগানের হাঁটাপথে।
সে এক অবর্ণনীয় সৌন্দর্য্য!

শালিমার বাগও মখমলি সবুজ ঘাস, শাহি ফোয়ারা, জাফরির কাজ সমৃদ্ধ খিলান, নানারঙের ফুল আর উচ্চকায় সব চিনার গাছে সজ্জিত। ১৬১৯ খ্রীস্টাব্দে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর এটি নির্মান করেন তাঁর প্রিয়তমা নূরজাহানের জন্য।

এছাড়াও আমরা দেখলাম হজরতবাল মসজিদ (হজরত মহম্মদের দাড়ির একটি চুল এখানে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে), প্রতাপ সিংহ মিউজিয়াম আর পড়ন্ত বিকেলে ডালের জলে শিকারাবিহার করতে করতে হলুদ সূর্যাস্ত।
ফিরান জড়ানো বিকেলে এখন শীতের হাতছানি। সাঁঝ আরেকটু গাঢ় হলে আগুনসেঁকা কাংড়ি ঘিরে জমে ওঠে কাওয়া-বিলাস।

রাতের বেলা ডিনারের খোঁজে বেরিয়ে আরেক অভিজ্ঞতা। লালচক থেকে খয়ামচকের রাস্তায় রাতে কাবাবের খুশবু ওড়ে। কাশ্মীরি খাদ্যের প্রচুর সুখ্যাতি শুনেছিলাম কিন্তু বুলেভার্ড রোডের শামিয়ানা আর মুঘল দরবারের সুস্বাদু খাবার সমস্ত উপমার উর্ধ্বে। এখানকার ওয়াজয়ান প্ল্যাটারে থাকে ইয়াকনি, রিশতা, গোশতবা, তবক মছলি ইত্যাদির এক আকর্ষণীয় সম্ভার। এখানকার বিভিন্ন বেকারিতে পাওয়া যায় বাখরখানি, কাশ্মীরি নান, শোচভারু ইত্যাদি। ঘোরাঘুরির ফাকে এইসব সুখাদ্যের স্বাদ নেওয়াটাও অত্যন্ত জরুরি।

শ্রীনগর থেকে পরদিন আমাদের যাত্রা শুরু হল সোনামার্গের উদ্দেশ্য। এপথে সঙ্গী হয় সিন্ধনালা (অর্থাৎ সিন্ধুনদ) আর পাইনের সারি। এ পথেই আরও এগোলে দুর্গম গিরিখাত পেরিয়ে জোজিলা পাস, দ্রাস, কাগিল হয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় লে অবধি।

পাহাড়ের ঢাল ঘেঁসে, সুন্দর ছিমছাম এক রেস্তোরাঁ। আলুগোবি, আলু পরাঠা আর গরম কফি সহযোগে প্রাতরাশ সারা হল সিন্ধুর বয়ে চলা দেখতে দেখতে।
ক্রমশ এগিয়ে চলেছি সোনামার্গের পথে। গতরাতে বৃষ্টি হয়ে গেলেও এখন মেঘ সরিয়ে আলতো আলোর আভাস।

আকাশচুম্বী তুষারাবৃত পর্বতচূড়া, সবুজ বুগিয়াল, পাইন আর চিনারের বন-- এই নিয়ে সোনামার্গ। আর আছে থাজিবাস গ্লেসিয়ার, যেখান থেকে নেমেছে সিন্ধুর একটি ধারা। দূরত্ব প্রায় ৪ কিমি। ঘোড়ার পিঠে চেপে ঘুরে আসা যায় সেখান থেকে। যদিও আমাদের সাথে বয়স্ক বাবা-মা থাকাতে আমাদের সেরকম কিছু ভাবনা প্রথমে ছিল না। কিন্তু গাড়ি থেকে নেমে একটু এগোতেই ঘোড়াওয়ালারা প্রায় ঘিরে ধরল আমাদের। বক্তব্য একটাই-- আমরা যেন ওদের থেকে ঘোড়া নিয়ে একটু ঘুরে আসি ওদিক থেকে। বন্যার জন্য এই মরসুমে প্রচুর লোকসান হয়েছে।
সত্যিই তো! খেয়াল করে দেখলাম, আমরা ছাড়া আর মাত্র দুটি পরিবার এসেছে এখানে। ওদের কথা শুনে বড্ড মন খারাপ হয়ে গেল।
উৎসাহের বশে তাই নিজেরা তো বটেই, বাবা-মা দেরও দিলাম ঘোড়ায় চাপিয়ে! অবশ্য ওরাই অভয় দিয়েছিল, " পিতাজী আর মাম্মীলোগোকো কোঈ দিক্কত নহি হোনে দেংগে। জান কবুল!"

ঘোড়ার পিঠে চেপে সবুজ মাখা সোনামার্গের চলতে চলতে চারপাশে চেয়ে এক অদ্ভুত ভাললাগায় মনটা খুশিয়াল হয়ে উঠল। এ পথে না এলে সত্যিই বড় ভুল হয়ে যেত।
প্রকৃতির বুক চিরে পাথুরে পায়ে চলা পথ মিশেছে দিগন্তরেখায়। পথের দুধারে আকাশছোঁয়া পাইন গাছের ফাঁক দিয়ে নরম আলো আর গাছের ছায়ারা লুকোচুরি খেলছে।পাতার ফাঁকে নানান শৃঙ্গের উঁকিঝু্ঁকি। মাঝে মাঝেই সবুজ বুগিয়াল। এদিক- ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছবির মত ঘর-বাড়ি। একদল ভেড়া মহানন্দে ঘাস খাচ্ছে। হিমেল হাওয়া চোখে, ঠোঁটে, গালে ছুঁয়ে দিয়ে যায় শিহরণ জাগিয়ে।

সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের সময় এ পাহাড়ের মাথায় লাগে সোনারঙের ছটা। তাই এই উপত্যকার নাম সোনামার্গ।

হিমবাহের খানিক আগে পুলের এপারে ঘোড়া ঘোড়া ছেড়ে হাঁটা শুরু করলাম। হিমবাহ পর্যন্ত পথ সামান্যই। আমরা এগিয়ে চললাম না থেমে।

"যে পথ চল হয়নি--আমি হাঁটি, থমকে দাঁড়াই--
দূর থেকে দেখি মিটমিট অালো-- মনে হয় ঐতো অার বেশিদূর নয়
আমি একা নই, আমার চলার পথে তুমিও হও সাথী.......
তোমার হাত ছুঁতে গেলেই অামি হয়ে যাই একা,
সেই ভালো, হারানোর চেয়ে...
ছায়ার সাথে থাকা।"

ক্রমশ..........

কীভাবে যাবেন--
জম্মু-তাওয়াই এক্সপ্রেসে চড়ে চলে আসুন জম্মু। সেখান থেকে গাড়িতে কিংবা বাসে আসতে হবে শ্রীনগর। দূরত্ব ৩০০ কিমি।
বিমানে গেলে দিল্লি থেকে শ্রীনগর এয়ারপোর্টে নামতে হবে।

শ্রীনগরে কোথায় থাকবেন--
ডালের পাড়ে বুলেভার্ড রোডের ডানদিকে রাত্রিবাসের জন্য রয়েছে অসংখ্য হোটেল। জম্মু-কাশ্মীর ট্যুরিজমেরই চারটি হোটেল রয়েছে। হোটেল হিমল, লালারুখ, কাশ্মীর।রেসিডেন্সি, হোটেল কংগপোস।
এছাড়াও প্রাইভেট হোটেলগুলোর মধ্যে হোটেল হামজা, ডাল ভিউ, নুরা প্যালেস ইত্যাদির সুনাম রয়েছে।

ছবিঃ Supratim Mandal

#Jammu & #Kashmir #Tourism
#জম্মু #কাশ্মীর #ভ্রমন #ডাল-লেক

descriptionকাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour  EmptyRe: কাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour

more_horiz
কাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour  15-04-10

descriptionকাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour  EmptyRe: কাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour

more_horiz
#কাশ্মীর
#kashmir
......................................................
এই পাহাড়ি শহরের ভোর রাতটি বড় মনকেমনিয়া। চারিদিকে অপার শান্তি, অপার নিস্তব্ধতা। এই মূহুর্তটায় গোটা উপত্যকা যেন ঘুমের চাদরে ঢেকে রয়েছে। কোথাও কোন তিক্ততা, অবিশ্বাস, ঘৃণা কিংবা অশান্তির লেশমাত্র নেই! কিংবা হয়তো রয়েছে সবটাই। বন্ধদরজা পেরিয়ে আছড়ে পড়তে পারে যেকোনো মুহূর্তেই।

আজ যাব #পহেলগাঁও। পথ অনেকটা। তাই ভোর ভোর রওনা দিতে হবে। ঘড়ির কাঁটা ছটা ছুঁতেই, মজিদভাইয়া তার গাড়ি নিয়ে হাজির। একচুমুকে কফির তলানিটুকু শেষ করে গাড়ির দিকে এগোলাম।

এখনও কোরা কাপড়ের মতো হয়ে রয়েছে
আকাশটা। পাখিদের কিচিরমিচির কানে আসছে আশেপাশের গাছ-গাছালি থেকে। আকাশের দিকে মুখ তুলে দেখি, স্তব্ধ আকাশের নীচে একটা পাহাড়ি কাক উড়ে যাচ্ছে। এক্কেবারে একা। আকাশে ফ্যাকাসে গোল চাঁদ।

শ্রীনগর ছেড়ে ১০-১২ কিমি যেতেই পড়ল পামপুরের বিখ্যাত স্যাফ্রন ফিল্ড বা জাফরান (অথবা, কেশর) ক্ষেত। ইরান এবং স্পেন ছাড়া পৃথিবীর আর যে একটি-দুটি জায়গায় জাফরান চাষ হয়, কাশ্মীর তাদের মধ্যে অন্যতম।
অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের প্রথম কয়েকটি দিন, শুধুমাত্র এই তিনসপ্তাহ এর "ব্লুমিং টাইম"। অর্থাৎ এইমুহুর্তে মাঠে জাফরান-পুষ্প প্রস্ফুটিত। এরকম সুযোগ জীবনে খুব কমই আসে।
আমরা ক্ষেতে গিয়ে জাফরান ফুল দেখার সাথে সাথে পথের ধারের দোকান থেকে কিনলাম প্রচুর শুকনো ফল। আখরোট, খোবানি, জাফরান, আমন্ড আরও কত কী!

জাফরানের গাছগুলো এতটাই ছোট যে ল্যাভেন্ডার রঙের জাফরান ফুলগুলোই কেবল মাটির বুকে মুখ তুলে চেয়ে থাকে। মিষ্টি গন্ধযুক্ত এই ফুলের কমলারঙের গর্ভকেশরই (স্টিগমা) হল আমাদের বিভিন্ন রান্নায় অত্যাবশ্যকীয় জাফরান। একটি ফুল থেকে পাওয়া যায় তিনটি স্টিগমা। ১০০ কেজি তাজা ফুলের থেকে সংগৃহীত হয় মাত্র ৩ কেজি স্টিগমা, যা থেকে সবচেয়ে দামি ও ভাল জাফরান, যা শাহী জাফরান নামে খ্যাত, বেরিয়ে আসে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন এ জিনিসের এরকম দাম হওয়ার পেছনে কি কারন!

আরও খানিকটা এগোতে পেলাম অবন্তীপুরার প্রসিদ্ধ বিষ্ণু আর শিব মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। অষ্টম শতকে নির্মিত এই হিন্দু মন্দিরগুলোর ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেন প্রখ্যাত বাঙালি পুরাতত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
এছাড়াও এপথেই হাল্লামুল্লাতে রয়েছে উইলো কাঠের ক্রিকেট ব্যাট ফ্যাক্টরি এবং মার্তন্ড সূর্যমন্দির।

খানাবল মোড় থেকে রাস্তা দু-ভাগ হয়েছে। একটি পথ চলে গেছে জম্মুর দিকে, আরেকটি পহেলগাঁও (দূরত্ব ৪৫ কিমি)। পথ এখানে বড়ই সুন্দর। একপাশে লিডারের উচ্ছ্বল ধারা আমাদের সংগী, আরেক পাশে আকাশ ছু্ঁই-ছুঁই পাইন,পপলার অার চিনার গাছের সারি।

পহেলগাঁওয়ের পথে পড়ে অজস্র আপেলবাগান। বছরের এই সময়ে সমস্ত গাছগুলো পাকা আপেলের ভারে নুইয়ে আছে। বাগানে বাগানে আপেল পাড়ার কাজ চলছে। মাটিতে ঘাসের উপর আপেল ছড়িয়ে আছে; যত খুশি তুলতে পারা যায় তা। কিন্তু গাছে হাত দেওয়া নিষেধ। এত আপেল একসাথে দেখে আমাদের বয়স্ক মা-বাবারা অবধি শিশুর মত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন। বাগান মালিক একটি কাঠের বাক্সে প্রায় ১৭ কেজি আপেল ভরে দিলেন। আমরা দাম মিটিয়ে (মাত্র ৪০ টাকা প্রতি কেজি) আবার রওনা হলাম।
একটা সময়ে পৌঁছে গেলাম ঘন সবুজ পাইনে ছাওয়া লিডার নদীর তীরে ছোট্ট উপত্যকা-গ্রাম পহেলগাঁও-এ। শান্ত, সবুজ, স্বপ্নের মত গ্রাম সেটি।

পরদিন সকালটা ঝকঝকে দেখাচ্ছে। এদিন আমাদের পহেলগাঁও-এর সাইটসিয়িং। যাবো চন্দনওয়ারি, বেতাব ভ্যালি এবং আরু। এছাড়াও দেখার মধ্যে রয়েছে মামলেশ্বর শিবমন্দির, প্রচুর পার্ক, গল্ফকোর্স, ট্রাউট ফিশিং সেন্টার এবং পাহাড়ের মাথায় অসাধারণ সুন্দর বৈশরণ।
সাইটসিয়িং এর জন্য স্থানীয় গাড়ি নিতে হয়। বাইরের গাড়ি চলে না।

চন্দনওয়ারি হচ্ছে অমরনাথ যাত্রার বেসক্যাম্প। প্রাকৃতিক শোভা অপূর্ব। বছরের অধিকাংশ সময়ে এখানে বরফ থাকে। গাড়ির ড্রাইভার আফতারকে দেখলাম আমাদের অমরনাথের রাস্তা দেখিয়ে দিতে দিতে ফস্ করে হাত ঠেকাল কপালে। কারণটা না জিজ্ঞেস করেও বুঝে নেওয়া যায়। অমরনাথের শিবজী ওদেরও যে দুটো রোজগারের ব্যবস্থা করে দেন বছরের বিশেষ সময়টিতে। ভারতের এই অখন্ডতার কত খন্ড চিত্রই না চোখে পড়েছিল এইভাবে!

চন্দনওয়ারি থেকে বাঁদিকে পিসুটপের পথ, প্রকান্ড গ্লেসিয়ার আর পান্ডবগুহা। কথিত আছে, পান্ডবরা মহাপ্রস্থানের যাওয়ার সময়ে এখানেই জিরিয়েছিলেন দুদন্ড।

বেতাবভ্যালির সৌন্দর্য্য একমাত্র স্কটল্যান্ডের কান্ট্রিসাইডের সাথেই তুলনা করা চলে। নীল আকাশে তুষারশুভ্র পর্বতমালা, নীচে ইস্ট লিডারের একটানা বয়ে চলা আর সবুজ ঘাসের গালিচা-- ঠিক যেন ফটো পোস্টকার্ড।

পহেলগাঁও থেকে আরুর দূরত্ব ১২ কিমি। এ পথ যেন আরও নির্জন এবং প্রকৃতি তাই আরও অপরূপা। আকাশে সারি দিয়ে বরফাবৃত শৃঙ্গ। নদী এপথে বাঁক নিয়েছে সহসাই। ঢেউ খেলানো সবুজ কার্পেটের মত বুগিয়ালে ইতস্ততঃ চড়ে বেড়াচ্ছে ভেড়ার পাল, কখনো সখনো ঘোড়ার দলও। পরিবেশের সাথে দারুণ মানানসই জম্মু-কাশ্মীর পর্যটন দপ্তরের সবুজ কাঠের বাংলোটিও।
বেশ ঠান্ডা, শনশনে বাতাস এখানে। দূরে পাইনের মাথায় মেঘ জমেছে, বেলা বুঝি পড়ে এল। এবার ফেরার পালা।

সেরাতে হোটেলের বারান্দা থেকে একবার নেমে এলাম লিডারের পারে। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে কোজাগরী চন্দ্রের পূর্ণ-প্রতিফলন দেখলাম লিডারের জলে। পিছনে তখন তুষারশুভ্র পাহাড়চূড়াগুলো ঝিকিমিকি হাসছিল আমাদের কান্ডকারখানা দেখে। অনাবিল জ্যোৎস্নায় পহেলগাঁও ধরা দিয়েছিল বড় আশ্চর্যরকম শান্ত, স্তব্ধ আর নিবিড়ভাবে। হঠাৎ মনে হয়েছিল--এ পৃথিবী বড়ই সুন্দর।

পরদিন ফিরলাম শ্রীনগরে।

সফরের শেষদিনে আমাদের গন্তব্য ছিল গুলমার্গ। শ্রীনগর থেকে ৫০ কিমি পশ্চিমে পিরপঞ্জাল পর্বতশ্রেণির কোলে ফুলের উপত্যকা গুলমার্গ। মে-জুন মাসে এখানকার পাহাড়-বুগিয়াল সেজে ওঠে রং-বেরঙের ফুলের জলসায়। রাস্তার দুপাশে যথারীতি ছবির মতো গ্রাম। সারাটা পথে পপলার আর চিনার গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারে পিরপঞ্জাল।

টাংমার্গে বাখরখানি সহযোগে জলখাবার সেরে সর্পিল পথে উঠে এলাম গুলমার্গ ভ্যালিতে। সেখানে তখন হাতেগোনা কয়েকটি পর্যটক-গাড়ি। শুনলাম, স্বল্প পর্যটকের কারণে বন্যার পর থেকেই বন্ধ রয়েছে গন্ডোলার দ্বিতীয় পর্যায়টি। প্রথম পর্যায়ের উচ্চতাটুকু অবধিই পৌঁছনো যাবে গন্ডোলাতে।

কিন্তু এ সফরে ভাগ্য আমাদের সহায় ছিল শুরু থেকেই! গাড়ি থেকে গল্ফকোর্সের গা ঘেঁসে ১ কিমি হেঁটে টিকিটঘরে গিয়ে জানতে পারলাম সেই মূহুর্ত থেকেই দ্বিতীয় পর্যায়ের গন্ডোলা যাত্রা শুরু হল। এশিয়ার দীর্ঘতম ও উচ্চতম এই কেবলকার চড়ার অভিজ্ঞতা সারাজীবন মনে রাখারই মত। দ্বিতীয় পর্যায়ে গন্ডোলা আমাদের পৌঁছে দিলো আফারওয়াত, যার উচ্চতা ১৩,৫০০ ফুট। রনবীর-দীপিকা অভিনীত "ইয়ে জবানি হ্যায় দিবানি" ছবির একটা দারুন দৃশ্যের শুট হয়েছিল এই আফারওয়াতেই।
অক্টোবরে এখন চারিদিকে বেশ বরফ জমে আছে। শীতে এই উপত্যকা ঢেকে যায় পুরু বরফের চাদরে। এখান থেকে দুচোখে ধরা দিল কারাকোরাম আর পাক-সীমান্ত।

বেলা বাড়তেই আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করলো। ফিরতি পথে শুরু হল তুষারপাতও।পেঁজা তুলোর মত ভিজে বরফ লেগে থাকল চোখে-মুখে আর সমস্ত মন জুড়ে রইল কাশ্মীর ভ্রমণের এই সুখস্মৃতি। অনিশ্চয়তার এই কাশ্মীর যাত্রায় টিউলিপ ছাড়া আর বুঝি কিছুই বাকি রইল না তবে!

পুনশ্চঃ
আজকের এই ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপে এই আশাই রাখবো, যাতে আগামীতে কাশ্মীর শিক্ষায়, শিল্পে, যাপনে আরও উন্নত হয়। হতশ্রী শিকারাচালক থেকে সোনামার্গের সেই গরীব ঘোড়াওয়ালারা একটু আর্থিক সমৃদ্ধির মুখ দেখে। এক-দুজন কাশ্মীরি আই.এ.এস বা অভিনেতা নন, পুরো কাশ্মীরবাসীই যেন রুটি-রুজির নিশ্চয়তা লাভ করেন।

কারণ,

"Agar firdaus bar roo-e zameen ast,
Hameen ast-o hameen ast-o hameen ast"-- Amir-e-Khusru.

কীভাবে যাবেনঃ
ক) শ্রীনগর থেকে পহেলগাঁও ৯৬ কিমি। আর জম্মু থেকে এলে বানিহাল পেরিয়ে ৩০০ কিমি।কয়েকটি বাস অনিয়মিত ভাবে চললেও এপথে গাড়ি ভাড়া করে নেওয়াই শ্রেয়। শ্রীনগর থেকে।এলে খরচ দিনপ্রতি ২৫০০-৩০০০ টাকা। তবে সাইটসিয়িং এর জন্য লোকাল গাড়ি নিতে হয়। খরচ ১৫০০ টাকা মতন।
খ) শ্রীনগর থেকে গুলমার্গের দূরত্ব ৬৫ কিমি। গাড়িভাড়া ২৫০০ টাকা মতন। সিজনে সরকারি বাস পরিষেবা চালু থাকে।

কোথায় থাকবেনঃ
পহেলগাঁওঃ পহেলগাঁওতে রাজ্য পর্যটন উন্নয়ন নিগমের ট্যুরিস্ট বাংলো রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে মাউন্ট ভিউ, ব্রাউনকটেজ, নিউ পাইন ভিউ, হোটেল হিল ভিউ ইত্যাদি।
আরুতে থাকতে চাইলে জে.কে.টি.ডি.সি-র হোটেল অ্যালপাইন রয়েছে।
গুলমার্গঃ গুলমার্গে থাকার জন্যেও রাজ্য পর্যটন উন্নয়ন নিগমের হোটেল গুলমার্গ
ট্যুরিস্ট হাট আছে। এছাড়া, উল্লেখযোগ্য বেসরকারি হোটেলগুলো হল, গ্রীন হাইটস,গুলমার্গ সাহারা, রয়াল পার্ক ইত্যাদি।

কলকাতায় যোগাযোগের ঠিকানা--
জম্মু-কাশ্মীর পর্যটন,
১২, জওহরলাল নেহেরু রোড,
কলকাতা-৭০০০১৩
ফোনঃ ২২২৮-৫৭৯১

(শেষ)

ছবিঃ Supratim Mandal

Jammu & Kashmir Tourism

descriptionকাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour  EmptyRe: কাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour

more_horiz
কাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour  Fb_im110
কাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour  Fb_im109
কাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour  Fb_im111

descriptionকাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour  EmptyRe: কাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour

more_horiz
কাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour  Fb_im113
কাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour  Fb_im114
কাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour  Fb_im112

descriptionকাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour  EmptyRe: কাশ্মীর ভ্রমন Kashmir Tour

more_horiz
Permissions in this forum:
You cannot reply to topics in this forum